ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে পরিচিত নীল দলের কয়েক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, নির্দিষ্ট অভিযোগ ও তদন্তের ভিত্তিতে নিয়ম মেনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযুক্ত শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাদের টার্গেট করা হয়েছে। একই সময়ে নীল দল নিষিদ্ধের দাবিকে কেন্দ্র করেও শিক্ষক রাজনীতি নতুন উত্তেজনার মুখে পড়েছে।
গত ২৮ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় সাতজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ১ আগস্ট আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দল এক প্রতিবাদলিপিতে দাবি করে, তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ। এর আগে ২৭ জুলাই বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল নীল দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেয়।
সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সাদেকা হালিম, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম এবং অধ্যাপক আফরোজা শেলীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল মুহিত, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আবু সারা শামসুর রউফ, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম এবং ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ বাহাউদ্দিনকে সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এক রকম নয়। কারও বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন, কারও বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আবার কারও বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী কর্মকাণ্ড, প্রশাসন ও সরকারবিরোধী অপপ্রচার, নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ বা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ও সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক আবদুস সালাম দাবি করছেন, প্রত্যেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ রয়েছে। তবে জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার ভাষ্য, এসব সিদ্ধান্ত কোনো শিক্ষক সংগঠন নেয়নি; বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্তৃপক্ষ হিসেবে সিন্ডিকেট নিয়ম মেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রক্রিয়াটি বর্তমান প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার আগেই শুরু হয়েছিল।
অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষকদের বক্তব্য ভিন্ন। অধ্যাপক সাদেকা হালিম এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অন্য কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। অধ্যাপক আফরোজা শেলী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি শিক্ষার্থীদের পক্ষে ছিলেন। সে সময় তিনি বিভাগের চেয়ারম্যান হওয়ায় উপাচার্যের ডাকা একটি প্রশাসনিক সভায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই উপস্থিতিকেই এখন তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, ওই সভায় তিনি কোনো বক্তব্য দেননি বা সরকারের পক্ষে কোনো অবস্থান নেননি। তার অভিযোগ, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি, যার ভিত্তিতে বরখাস্তের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। তার মতে, তিনি নীল দলের সমর্থক হিসেবে পরিচিত বলেই রাজনৈতিক বিবেচনায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষক বলেন, তিনি এখনো আনুষ্ঠানিক চিঠিই পাননি। তার দাবি, তিনি কখনোই জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করেননি। বরং কোটা সংস্কার, মানবাধিকার ও সাম্যের মতো বিষয়কে সমর্থন করেছেন। তিনি শুধু পরবর্তী সময়ে মব সহিংসতার সমালোচনা করেছিলেন। তার মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক মতের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষককে শাস্তি দেওয়া গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অধ্যাপক আব্দুল মুহিত অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করার পরও তাকে মিথ্যা অভিযোগে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, প্রকৃতপক্ষে কয়েক শিক্ষক নিজেদের স্বার্থে তাকে পদচ্যুত করেছেন। তিনি বলেন, তিনি গবেষণা, পাঠদান ও একাডেমিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কোনো অভিযোগও ছিল না। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অধ্যাপক আবু সারা শামসুর রউফও একই ধরনের অভিযোগ করেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের পক্ষে বা বিপক্ষে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি নিয়মিত গবেষণা ও একাডেমিক কাজ করেছেন। তার মতে, বর্তমান প্রশাসন ভিন্নমত দমন করছে এবং রাজনৈতিক কারণে শিক্ষকদের টার্গেট করা হচ্ছে।
অধ্যাপক মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সঙ্গে তাকে প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো সামঞ্জস্য নেই। তিনি নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং নীল দলের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, তার রাজনৈতিক আদর্শই তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
এদিকে নীল দল দাবি করেছে, শুধু সাত শিক্ষক নন, মোট ২৩১ জন শিক্ষক এবং বহু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শাস্তির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক অধ্যাপক জিনাত হুদার স্বাক্ষরিত ১ আগস্টের প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে নীল দলকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হয়েছে।
একই সঙ্গে উপাচার্য, দুই সহ-উপাচার্য ও সাদা দলের আহ্বায়ককে নিয়ে চার সদস্যের যে কমিটি করা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
নীল দলের দাবি, ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ অনুযায়ী শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে সংগঠন করার অধিকার রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিন ধরে নীল দল, সাদা দল ও গোলাপি দলের সহাবস্থান রয়েছে। তাদের মতে, গত দুই বছরে তদন্ত ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চালানো হয়েছে, যা উচ্চশিক্ষার জন্য অশনিসংকেত।
অন্যদিকে সাদা দল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সংগঠনটির নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক মো. আল আমীন বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। তার দাবি, নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, বিতর্কিত নির্বাচনকে সমর্থন করা এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় সরকারের পক্ষে প্রকাশ্য ভূমিকা রাখার মতো নানা ঘটনার তথ্য-উপাত্ত যাচাই করেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সাদা দলের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট নীল দলের সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল। ৩ আগস্ট মানববন্ধন ও শোভাযাত্রা থেকেও আন্দোলনকারীদের দায়ী করা হয়। এ ছাড়া ১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং ১৭ জুলাই হল ছাড়ার ঘটনায়ও তৎকালীন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই ২৭ জুলাই উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক আবুল কালাম সরকার বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বিচার হয়নি। তাই নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইনি প্রশ্ন। সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি, বিবিসি বাংলাকে বলেন, ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশে ‘সাময়িক বরখাস্ত’ নামে কোনো বিধান নেই। কোনো শিক্ষককে শাস্তি দিতে হলে প্রথমে অভিযোগের তদন্ত, এরপর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
তার মতে, শুধু ‘জুলাইবিরোধী’ মনোভাবের অভিযোগ কোনো আইনি অপরাধ হতে পারে না। অভিযোগ অবশ্যই নির্দিষ্ট হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তা জানাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধানস্বীকৃত অধিকার। কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করার বিষয়টিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ বলা যায় না। তার ভাষায়, “জঙ্গি সংগঠনের পক্ষে কথা বলা অপরাধ। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও আওয়ামী লীগ নিয়ে কথা বলা অপরাধ নয়।”
১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশের ৫৬(৩) ধারায় বলা হয়েছে, নৈতিক স্খলন বা অদক্ষতার অভিযোগে কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত করার আগে তদন্ত করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে নিজের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। অথচ অভিযুক্ত কয়েক শিক্ষক দাবি করেছেন, তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি। কেউ কেউ এখনো আনুষ্ঠানিক আদেশপত্রও হাতে পাননি।
সব মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথমত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ের ভূমিকার দায় নির্ধারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয় ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা কোথায় টানা হবে।
প্রশাসন বলছে, নিয়ম মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষকরা বলছেন, এটি রাজনৈতিক প্রতিশোধ। আর আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া, নির্দিষ্ট অভিযোগ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করাই আইনের মূল শর্ত।
খবরটি শেয়ার করুন