ছবি: সংগৃহীত
তুরস্কের পূর্বাঞ্চলে নূহের (আ.) নৌকার সন্ধানে নতুন করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত জেলার তেলচেকের গ্রামের কাছে অবস্থিত দুরুপিনার ফরমেশনকে ঘিরে চলছে এই গবেষণা। নৌকার মতো দেখতে প্রায় ১৫৭ মিটার দীর্ঘ এই ভূতাত্ত্বিক গঠনটি ছয় দশকের বেশি সময় ধরে নূহের (আ.) নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে। তবে এত বছর পরও এটি নূহের (আ.) নৌকার ধ্বংসাবশেষ—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। চলতি বছরের অনুসন্ধানেও এখন পর্যন্ত এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি গবেষকেরা।
এবারের গবেষণার বিশেষত্ব হলো, শুধু ওপর থেকে পর্যবেক্ষণ নয়, মাটির নিচেও অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ রাডার, বৈদ্যুতিক প্রতিরোধের টমোগ্রাফি, ত্রিমাত্রিক মানচিত্র, মাটির নমুনা সংগ্রহ এবং কোর ড্রিলিং বা গভীর থেকে মাটির স্তর তুলে আনার পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। গবেষকেরা ভূগর্ভে পাওয়া ফাঁপা জায়গা, সরল রেখার মতো কাঠামো এবং সম্ভাব্য কক্ষ বা করিডরের নমুনা ও তথ্য বিশ্লেষণ করছেন।
গবেষণা প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তুরস্কের সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক জানকার আতিলা। তার সঙ্গে কাজ করছেন মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্স। তুরস্কের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির সহযোগিতায় গবেষণাটি পরিচালিত হচ্ছে। গবেষণা দলের তথ্যমতে, চলতি বছরের মাঠপর্যায়ের কাজে পাঁচ দেশের প্রায় ২০ জন গবেষক ও শিক্ষার্থী যুক্ত ছিলেন।
১৯৫৯ সালে তুরস্কের সেনাবাহিনীর মানচিত্রবিদ ক্যাপ্টেন ইলহান দুরুপিনার আকাশ থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অস্বাভাবিক এই গঠনটি শনাক্ত করেন। পরে তার নাম অনুসারে এর নাম হয় দুরুপিনার ফরমেশন। আরারাত পর্বতের কাছাকাছি অবস্থিত এই গঠনটি ওপর থেকে দেখলে অনেকটা নৌকার মতো। সেই আকৃতিই নূহের (আ.) নৌকার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকার ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলে।
কিন্তু আকৃতি মিলে যাওয়াই নূহের (আ.) নৌকা শনাক্ত করার প্রমাণ নয়। বরং শুরু থেকেই এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দুরুপিনার ফরমেশনকে মানুষের তৈরি কোনো কাঠামো নয়, প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। ওই গবেষণায় বলা হয়, এলাকার শিলা ও ভূতাত্ত্বিক উপাদানের স্বাভাবিক গঠন এবং ক্ষয়প্রক্রিয়ার কারণে জায়গাটি নৌকার মতো আকৃতি পেতে পারে। ফক্স নিউজের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও ওই গবেষণার কথা উল্লেখ করে সংশয়বাদী বিজ্ঞানীদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
এর মধ্যেই চলতি বছরের গবেষণায় নতুন কিছু তথ্য পাওয়ার দাবি করেছেন গবেষকেরা। ভূগর্ভস্থ রাডার দিয়ে জরিপ করে তারা কয়েকটি ফাঁপা জায়গার সন্ধান পেয়েছেন। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব জায়গার কোনো কোনোটি করিডর বা কক্ষের মতো দেখতে। কিছু ফাঁপা জায়গা মাটির প্রায় ৩ থেকে ৪ মিটার নিচে। আবার কোনো কোনো কাঠামো প্রায় ১৩ মিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। তবে এগুলো মানুষের তৈরি কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে অ্যান্ড্রু জোন্স বলেছেন, ফরমেশনটির ভেতরের মাটিতে আশপাশের মাটির তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি জৈব পদার্থ পাওয়া গেছে। ভেতরের মাটিতে পটাশিয়ামের পরিমাণও প্রায় ৩৮ শতাংশ বেশি বলে তিনি দাবি করেছেন। পাশাপাশি অম্ল-ক্ষারত্বের মাত্রায় বড় পার্থক্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তার ব্যাখ্যা, দীর্ঘ সময় ধরে কাঠ বা অন্য কোনো জৈব পদার্থ পচে থাকলে মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে এমন পরিবর্তন ঘটতে পারে।
তবে এখানেও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রয়েছে। মাটিতে বেশি জৈব পদার্থ পাওয়া মানেই সেখানে নূহের (আ.) নৌকা ছিল—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। জোন্সের বক্তব্যও মূলত সম্ভাবনার কথা বলে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও নমুনা পরীক্ষা, গভীর স্তর বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। তুরস্কের গবেষণা দলের প্রকাশিত তথ্যেও বলা হয়েছে, এখনো নৌকার ধ্বংসাবশেষ থাকার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এবারের অনুসন্ধানে কোর ড্রিলিংও শুরু হয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে গবেষণা-সংশ্লিষ্ট সংগঠন নোয়াস আর্ক স্ক্যানস জানায়, প্রায় ১৮ মিটার গভীর পর্যন্ত কোর বা মাটির স্তম্ভ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে মাটির গঠন, জৈব পদার্থ এবং বিভিন্ন স্তরের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা হবে। পরে ভূগর্ভে শনাক্ত করা ফাঁপা জায়গাগুলোতে সরু পথে বিশেষ রোবট পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত সংগঠনটির দাবি, ভূগর্ভে শনাক্ত একটি সম্ভাব্য করিডর ২৫০ ফুটের বেশি দীর্ঘ। তবে এই দাবি এখনো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাডারে কোনো ফাঁপা বা সরল কাঠামো দেখা গেলেই সেটি কাঠের নৌকার অংশ—এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না। এ কারণেই নমুনা পরীক্ষা ও সরাসরি পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব দিচ্ছেন গবেষকেরা।
এবারের কাজ নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহও বেড়েছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি তথ্যচিত্র নির্মাতা দল সেখানে গবেষণার কাজ ধারণ করছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত অভিযাত্রী ও টেলিভিশন উপস্থাপক বেয়ার গ্রিলসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দলও রয়েছে। তুরস্কের চলচ্চিত্র কমিশনের সভাপতি সাইত ইয়ারদিমজি বলেছেন, আন্তর্জাতিক তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য এই অঞ্চল বেছে নেওয়ায় দোগুবায়াজিতের পরিচিতি বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সও ১৭ সেপ্টেম্বরের ভিডিও প্রতিবেদনে গবেষণাস্থলে রাডার জরিপ ও কোর ড্রিলিংয়ের দৃশ্য প্রকাশ করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আনাদোলুর তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, গবেষকেরা প্রথমে জিপিএস অবস্থান নির্ধারণ করে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করেন। এরপর বিশেষায়িত রাডারে ভূগর্ভের ছবি নেওয়া হয়। সেই ছবিতে সম্ভাব্য ফাঁপা জায়গা শনাক্ত হওয়ার পর মাটির নমুনা সংগ্রহ শুরু হয়। রয়টার্স একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে, এই গবেষণায় এখনো দুরুপিনার ফরমেশনের ভেতরে নূহের (আ.) নৌকার অবশেষ থাকার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজও চলতি বছরের এপ্রিল ও জুনে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে গবেষকদের নতুন মাটির পরীক্ষার ফল এবং ভূগর্ভস্থ কাঠামোর দাবি তুলে ধরা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ১৯৯৬ সালের ভূতাত্ত্বিক গবেষণার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে দুরুপিনারকে প্রাকৃতিক গঠন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। ফলে নতুন তথ্য পুরোনো বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে, কিন্তু বিতর্কের অবসান ঘটায়নি।
দুরুপিনার ফরমেশন নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন অনুসন্ধান হয়েছে। মার্কিন উদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফ্যাসোল্ড একসময় জায়গাটিকে প্রাচীন জাহাজের অবশিষ্টাংশ বলে মনে করেছিলেন। ফরমেশনটির দৈর্ঘ্যও প্রায় ১৬৪ মিটার বলে মাপা হয়েছিল, যা বাইবেলে বর্ণিত নূহের নৌকার দৈর্ঘ্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়। পরে ফ্যাসোল্ড নিজেই ওই তত্ত্ব থেকে সরে আসেন। ফলে অতীতের এসব দাবি বর্তমান গবেষকদের জন্য সতর্কতার একটি কারণ।
এবারের গবেষণা শেষ হলেও ফল পেতে আরও সময় লাগবে। মাঠপর্যায়ের সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হবে। গবেষকেরা আগামী বছর এবং তার পরের বছরও অনুসন্ধান চালানোর পরিকল্পনা জানিয়েছেন। চলতি পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ভূগর্ভে পাওয়া কাঠামোগুলো আসলে কী। সেগুলো মানুষের তৈরি কোনো কাঠামোর অংশ, প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠন, নাকি অন্য কোনো কারণে সৃষ্টি হয়েছে—তার উত্তর এখনো মেলেনি।
নূহের (আ.) নৌকার কাহিনি ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম ধর্মীয় ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ। তাই দুরুপিনার ফরমেশন নিয়ে আগ্রহ শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকও। কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রশ্নটি আলাদা। এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা একটি অস্বাভাবিক ভূগর্ভস্থ কাঠামো ও মাটির রাসায়নিক পার্থক্যের ইঙ্গিত দেয়। এটিকে নূহের (আ.) নৌকার প্রমাণ বলতে হলে আরও কঠোর পরীক্ষা, স্বাধীন যাচাই এবং বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। সেই পরীক্ষার ফল না আসা পর্যন্ত দুরুপিনার ফরমেশনকে নূহের (আ.) নৌকা হিসেবে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করার দাবি সময়ের আগেই হবে।
খবরটি শেয়ার করুন