বৃহস্পতিবার, ১লা অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** পাঁচ দিনের ব্যবধানে শেখ হাসিনার নিউইয়র্ক-লন্ডনে বক্তব্য, ঢাকা কেন প্রতিবাদ জানায়নি *** স্বৈরাচার এবং গুপ্ত আবার একসঙ্গে হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী *** সরকার সর্বশক্তি দিয়ে দেশে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে: প্রধানমন্ত্রী *** বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্কে রপ্তানি, বাড়ছে আয় *** ‘আড়াই মাস পর ফেসবুক ভিডিওর কল্যাণে স্ত্রীকে খুঁজে পেলাম’ *** মার্কিন ভিসাপ্রার্থী বিদেশি সাংবাদিকদের সামাজিকমাধ্যমের প্রোফাইল যাচাই শুরু *** মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে রোহিঙ্গা যুবক আহত *** সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য দূতাবাসের জরুরি সতর্কবার্তা *** ভারতের কাছে নাজেহাল শ্রীলঙ্কাই এখন বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ *** এক পরিবর্তন নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামছে বাংলাদেশ

সুখবর এক্সপ্লেইনার

১৭৪ যাত্রীর জীবন বাঁচানো সেই ভারতীয় পাইলট স্মিত মছার কে

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ০৬:১৫ অপরাহ্ন, ১লা অক্টোবর ২০২৬

#

ক্যাপ্টেন স্মিত মছার। ছবি: ইসরায়েলে ভারতীয় দূতাবাস

দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিব যাচ্ছিল ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী বিমান। মাঝআকাশে হঠাৎ বদলে যায় পরিস্থিতি। ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে শুরু হয় সংঘর্ষ। একপর্যায়ে সহকারী পাইলটের হামলায় গুরুতর আহত হন বিমানটির প্রধান পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মছার। একই সময় বিমানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে উড়োজাহাজটি পরিণত হতে পারত ভয়াবহ এক দুর্ঘটনার কেন্দ্রে।

কিন্তু আহত অবস্থাতেও ককপিটের দরজা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন স্মিত। সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত বিমানের ভেতরে থাকা অন্য পাইলট, ক্রু ও যাত্রীদের ককপিটে ঢোকার সুযোগ করে দেয়। হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পরে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। ফ্লাইটে থাকা ১৭৪ জন যাত্রীই শেষ পর্যন্ত নিরাপদে ইসরায়েলে পৌঁছান। ঘটনাটির পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্মিতের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন।

তবে ঘটনাটির পুরো চিত্র এখনো পরিষ্কার নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাধারণ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বলেছে, এটি একটি নিরাপত্তাজনিত ঘটনা। তদন্ত চলছে। কর্তৃপক্ষ সবাইকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অনুমাননির্ভর তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে বলেছে। ফ্লাইদুবাইও বলেছে, ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল এবং ঘটনার কারণ ও উদ্দেশ্য এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের বিষয়।

ঘটনাটি ঘটে ৩০ সেপ্টেম্বর। ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটটি দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করে। উড়োজাহাজটি ছিল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮। উড্ডয়নের দুই ঘণ্টার বেশি সময় পর সৌদি আরবের আকাশসীমার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় ককপিটে ওই সংঘর্ষ শুরু হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর বিমানটি ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে প্রায় ১৪ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়।

ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, বিমানটি প্রায় ৩৩ হাজার ফুট উচ্চতায় ছিল। এরপর অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। যাত্রী ও ক্রুদের তৎপরতার পর বিমানটির গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণের অনুরোধ জানানো হয়। তাবুক বিমানবন্দর জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪৪ মিনিটে তারা বিমানটির জরুরি অবতরণের বার্তা পায়। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে।

এখানেই সামনে আসে ক্যাপ্টেন স্মিত মছারের ভূমিকা। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রক্তাক্ত অবস্থায় ককপিটের মেঝেতে পড়ে থেকেও তিনি ককপিটের দরজা খোলার ব্যবস্থা করেন। দরজা খোলার পর যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ভেতরে ঢুকে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। বিমানে থাকা আরও দুজন প্রশিক্ষিত পাইলটও পরে বিমানটি নিরাপদে অবতরণে সহায়তা করেন।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র গার্ডিয়ান জানিয়েছে, স্মিতের দরজা খোলার সিদ্ধান্তের কারণেই অন্যরা ককপিটে ঢোকার সুযোগ পান। ওই ঘটনার সঙ্গে একজন যাত্রী ও দায়িত্বে না থাকা পাইলটদেরও ভূমিকা ছিল। ফলে পুরো ঘটনাটিকে শুধু একজন পাইলটের একক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলে ঘটনাটির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।

স্মিত মছারের পেশাগত পরিচয়ও ঘটনাটির গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। মুম্বাইয়ে বেড়ে ওঠা এই ভারতীয় পাইলটের উড়োজাহাজ চালানোর অভিজ্ঞতা প্রায় দেড় দশকের। টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস তার পেশাগত তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, তার মোট উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা প্রায় ৯ হাজার ৭৫০ ঘণ্টা। এর মধ্যে ৬ হাজার ৪০০ ঘণ্টার বেশি সময় তিনি প্রধান পাইলট হিসেবে উড়োজাহাজ পরিচালনা করেছেন।

তার বিমানচালক হওয়ার পথটিও ছিল কিছুটা অপ্রত্যাশিত। রয়টার্স জানিয়েছে, শৈশব থেকেই পাইলট হওয়ার স্বপ্ন তার ছিল না। পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে তিনি প্রথমে বস্ত্র প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়ার সময় একটি বিমান চলাচলবিষয়ক সেমিনারে অংশ নিয়ে তার পরিকল্পনা বদলে যায়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি বিমানচালক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর নিউজিল্যান্ডে প্রশিক্ষণ নেন।

নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনে মেনল্যান্ড এয়ারে তার প্রশিক্ষণের তথ্যও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ফিলিপ কিন বিবিসিকে বলেছেন, স্মিতকে তিনি শান্ত স্বভাবের মানুষ হিসেবে মনে রেখেছেন। জরুরি অবতরণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মাঝআকাশে ককপিটের ভেতরে এমন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রশিক্ষণ বাস্তবে প্রায় অকল্পনীয়।

২০১১ সালে স্মিত ভারতের স্পাইসজেটে যোগ দেন। সেখানে প্রায় ১১ বছর কাজ করেন। পরে তিনি সিনিয়র কমান্ডার এবং লাইন প্রশিক্ষণ ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেন। লাইন প্রশিক্ষণ ক্যাপ্টেন হিসেবে তার দায়িত্বের মধ্যে অন্য পাইলটদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা যাচাই এবং উড্ডয়ন নিরাপত্তার মান বজায় রাখার বিষয়ও ছিল। ২০২২ সালের জুনে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে সরাসরি ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দেন।

এই পেশাগত অভিজ্ঞতাই গত বুধবারের সংকট মোকাবিলায় কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে প্রায় ১০ হাজার ঘণ্টার উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণ ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করার বিষয়টি তার পেশাগত প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ঘটনাটির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি নতুন করে আলোচনায় আসে।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হামলাকারী পাইলটের উদ্দেশ্য। রয়টার্স জানিয়েছে, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে বিমানটি বিধ্বস্ত করার সম্ভাব্য চেষ্টা হিসেবে তদন্ত করছেন। হামলাকারী ওমানের নাগরিক বলে বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে। তবে তার উদ্দেশ্য বা পেছনে কোনো সংগঠন ছিল কি না, সেটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইউএইর বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও তদন্তের কারণ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।

এ কারণে ঘটনাটিকে এখনই সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে চূড়ান্তভাবে অভিহিত করা নিয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। এপি, রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও ‘অভিযোগ’, ‘সম্ভাব্য’ এবং ‘তদন্তাধীন’ শব্দ ব্যবহার করেছে। ফ্লাইদুবাই নিজেও ঘটনার কারণ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুমান না করার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ইতিমধ্যে সামনে এসেছে। ককপিটের ভেতরে থাকা একজন পাইলট কীভাবে অন্য পাইলটকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করার সুযোগ পেলেন, সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো পাইলটের মানসিক বা আচরণগত পরিবর্তন, নিরাপত্তা যাচাই এবং কর্মীদের প্রবেশাধিকারসংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেসব বিষয়ও তদন্তে আসতে পারে। এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

ঘটনার পর আহত স্মিতকে তাবুকের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। ভারতীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১ অক্টোবর তাকে সাহসিকতার জন্য প্রশংসা করেন এবং তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। ভারতের সরকারি প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোও মোদির বক্তব্য প্রকাশ করেছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও স্মিতের প্রশংসা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আহত অবস্থায় ককপিটের দরজা খুলে দেওয়ার মাধ্যমে স্মিত অন্যদের হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ করে দেন এবং বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে ভূমিকা রাখেন।

অন্যদিকে, ঘটনাটিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্মিতকে ঘিরে ব্যাপক প্রশংসা তৈরি হলেও তদন্তের ফল না আসা পর্যন্ত কিছু তথ্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ না করাই নিরাপদ। কারণ প্রথম কয়েক ঘণ্টায় যাত্রীসংখ্যা, হামলার ধরন, বিমানের পতনের সময় এবং ককপিটে কে কী করেছিলেন—এসব বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। এপি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে ১৭৪ যাত্রীর তথ্য এসেছে, আবার কিছু সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে।

সবশেষে স্মিত মছারের পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়তো তার প্রায় ১০ হাজার ঘণ্টার পেশাগত অভিজ্ঞতা নয়; বরং ভয়াবহ সংকটের মধ্যে কয়েক সেকেন্ডের একটি সিদ্ধান্ত। গুরুতর আহত অবস্থায় ককপিটের দরজা খোলার সিদ্ধান্তটি যাত্রী ও ক্রুদের হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে। এরপর অন্য পাইলটেরা বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেটিকে তাবুকে নামান। তাই এ ঘটনার পেছনে একজনের পাশাপাশি একাধিক মানুষের দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সমন্বিত ভূমিকা ছিল।

স্মিত মছার এখন সৌদি আরবের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আর ফ্লাইদুবাই এফজেড১০৭৩-এর ঘটনাটি তদন্ত করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সেই তদন্তই শেষ পর্যন্ত জানাবে, ককপিটে ঠিক কী ঘটেছিল, হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এত বড় একটি নিরাপত্তা পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো। আপাতত নিশ্চিত যে, ৩০ সেপ্টেম্বরের ওই ফ্লাইটে একটি সম্ভাব্য ভয়াবহ বিপর্যয় এড়ানো গেছে—আর গুরুতর আহত অবস্থায় ককপিটের দরজা খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া ক্যাপ্টেন স্মিত মছার সেই ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

স্মিত মছার

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250