মঙ্গলবার, ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩১শে ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** সাতজনের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ *** ময়মনসিংহ মেডিকেলে অগ্নিকাণ্ড: ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি *** ডাকযোগে ভোট কঠিন করতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প, ঠেকিয়ে দিল আদালত *** কাদেরসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলার রায় আজ *** ইরান দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি চায়—ফের দাবি ট্রাম্পের *** ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ৮ জনের মৃত্যু, এক দিনে সর্বোচ্চ সংক্রমণ *** পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সরকারের ৩ কমিটি গঠন, ৫২ বিশিষ্টজনের উদ্বেগ *** ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি অপসারণ ও বঙ্গবন্ধুর ছবি পুনঃস্থাপনের দাবিতে তিন ছাত্রসংগঠনের বিক্ষোভ *** মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতন: পদক্ষেপ নিতে সরকারকে আইনি নোটিশ *** হাইকোর্টের রায় স্থগিতের আবেদনে সাড়া পায়নি ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণ

বৃষ্টি এল না, তবু নাচের ঢেউয়ে ভিজল চারুকলার বকুলতলা, জনসমুদ্রে ‘ঘনঘটা’

সংস্কৃতি প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৫:১৭ অপরাহ্ন, ১৭ই জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

কথা ছিল, একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজার। সেই আহ্বানেই গত এক সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল একটি বাক্য—‘এই আয়োজনে ছাতা আনতে মানা, কারণ ভিজবো একসাথে।’ কিন্তু আজ শুক্রবার সকাল পর্যন্ত আকাশ কেবল মেঘে ঢাকা রইল, কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি আর নামল না। বৃষ্টি না এলেও ভিজেছে মানুষ—সুরে, নৃত্যে, উচ্ছ্বাসে আর এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক মিলনে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলা এদিন যেন পরিণত হয়েছিল এক চলমান উৎসবে। সেখানে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। দর্শকের ঢেউ আর শিল্পীদের ছন্দ মিলেমিশে তৈরি করেছিল এক অনন্য দৃশ্য।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকাল ১১টায় চারুকলা অনুষদের ঐতিহ্যবাহী বকুলতলার মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ নৃত্যানুষ্ঠান ‘ঘনঘটা ২’। একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার অর্থি আহমেদের উদ্যোগে এবং চারুকলা অনুষদের সহযোগিতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠান বর্ষাকে ঘিরে হলেও তার পরিধি ছিল আরও বিস্তৃত। বর্ষার সৌন্দর্য, বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মানুষের প্রতি দায়বোধ—এই তিনের মেলবন্ধনেই সাজানো হয়েছিল পুরো আয়োজন।

মঞ্চে যখন ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ গানের তালে একঝাঁক তরুণ শিল্পী নৃত্য পরিবেশন করছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল, শুধু মঞ্চ নয়, নাচ যেন ছড়িয়ে পড়েছে দর্শকসারিতেও। হাততালি, হাসি আর শরীরের অজান্তে দুলে ওঠা ছন্দে হাজারো দর্শক হয়ে উঠেছিলেন এই পরিবেশনারই অংশ। কেউ মোবাইল ফোনে মুহূর্তগুলো ধরে রাখছিলেন, কেউ আবার মুগ্ধ হয়ে শুধু দেখছিলেন। বৃষ্টি না থাকলেও চারুকলার বকুলতলা যেন বর্ষারই আরেক ভাষা খুঁজে পেয়েছিল।

এই আয়োজনের আরেকটি বিশেষ দিক ছিল এর মানবিক আবেদন। দেশের সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় অনুষ্ঠানস্থলে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অর্থি আহমেদ জানান, প্রায় চার মাস আগে থেকেই ‘ঘনঘটা ২’-এর প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। কিন্তু দেশের বন্যা পরিস্থিতি সামনে আসার পর আয়োজকেরা মনে করেন, এমন দুর্যোগের সময়ে শুধু উৎসব করাই যথেষ্ট নয়; মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়ও শিল্পীদের রয়েছে।

অর্থি আহমেদ বলেন, ‘শিল্পী হিসেবে সমাজের প্রতি আমাদের একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। তাই বর্ষা উদযাপনের পাশাপাশি বন্যাকবলিত দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও চেষ্টা করছি আমরা।’

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমির সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে তহবিলে অবদান রাখেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠানস্থলে স্থাপিত জাগো ফাউন্ডেশনের বুথের মাধ্যমে দর্শনার্থীরাও মুক্তহস্তে অনুদান দেন বন্যার্ত মানুষের জন্য। ফলে নাচের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন কেবল শিল্পচর্চার প্রকাশ ছিল না, ছিল সহমর্মিতারও এক নীরব ভাষা।

অর্থি আহমেদ গত সপ্তাহে এই আয়োজনের মহড়ার একটি ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করে লিখেছিলেন, ‘এই আয়োজনে ছাতা আনতে মানা, কারণ ভিজবো একসাথে।’ সেই আহ্বানেই সাড়া দিয়ে শুক্রবার সকাল থেকেই চারুকলা প্রাঙ্গণে ভিড় জমান হাজারো সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ আবার একাই চলে এসেছিলেন এই বর্ষা-উৎসবের অংশ হতে।

অর্থি আহমেদের মতে, নগরজীবনে বর্ষা এখন অনেকের কাছেই জলাবদ্ধতা আর যানজটের ভোগান্তির নাম। অথচ বাংলার সংস্কৃতিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বর্ষা উৎসব, সৌন্দর্য আর প্রাণের প্রতীক। সেই সাংস্কৃতিক চেতনাকে নতুন প্রজন্মের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরতেই এই আয়োজন। তার ভাষায়, ‘মানুষ যেন শুধু বর্ষা উদযাপনই না করে, একই সঙ্গে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও সুযোগ পায়—আমরা মূলত এমন একটি মানবিক পরিসর তৈরি করতে চেয়েছি।’

প্রায় ৯০ মিনিটের এই বর্ণিল আয়োজনে পরিবেশিত হয় মোট ১৬টি নৃত্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলার লোকজ ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত এসব পরিবেশনায় অংশ নেন ৩ থেকে ৭০ বছর বয়সী প্রায় ৩০০ শিল্পী। এই বৈচিত্র্যই অনুষ্ঠানটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। একই মঞ্চে যেমন ছিল খুদে শিশু ও প্রথমবারের মতো মঞ্চে ওঠা নৃত্যশিল্পীদের উচ্ছ্বাস, তেমনি ছিলেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক ও গৃহিণীসহ নানা পেশার মানুষ। পেশার ভিন্নতা সেখানে কোনো বিভাজন তৈরি করেনি; নাচের ভাষাই হয়ে উঠেছিল সবার একমাত্র পরিচয়।

অনুষ্ঠানজুড়ে দর্শকের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বকুলতলার প্রতিটি কোণ মানুষে পূর্ণ হয়ে ওঠে। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, কেউ গাছের নিচে আশ্রয় নিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। শিল্পীদের প্রতিটি পরিবেশনার সঙ্গে দর্শকদের উচ্ছ্বাসও যেন আরও ঘন হয়ে উঠছিল। শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি না এলেও কেউ যেন সেই অভাব অনুভব করেননি। বরং সুর, তাল, নৃত্য আর মানুষের মিলিত উপস্থিতিই সৃষ্টি করেছিল এক অন্যরকম বর্ষা।

প্রসঙ্গত, গত বছর অর্থি আহমেদকে একুশে পদক দেওয়ার পর তা নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছিল। তবে শুক্রবারের এই আয়োজন অনেকের কাছেই ছিল তার শিল্পীসত্তার এক শক্তিশালী প্রকাশ। নান্দনিক পরিকল্পনা, শত শত শিল্পীর অংশগ্রহণ এবং মানবিক বার্তায় ভরপুর এই আয়োজন যেন শিল্পের ভাষাতেই সব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হয়ে উঠল।

আয়োজকদের ভাষ্য, গত বছরের প্রথম ‘ঘনঘটা’ অনুষ্ঠান যে বিপুল সাড়া পেয়েছিল, সেটিই এবার আরও বড় পরিসরে ‘ঘনঘটা ২’ আয়োজনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। বর্ষার গান, নাচ আর মানুষের প্রতি দায়বোধ—সব মিলিয়ে চারুকলার বকুলতলায় শুক্রবার সকালের এই আয়োজন যেন মনে করিয়ে দিল, প্রকৃত উৎসব কেবল আনন্দের নয়; মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও। আর কখনো কখনো বৃষ্টি না নামলেও, মানুষের হৃদয়ে উৎসবের জলধারা ঠিকই নেমে আসে।

ঘনঘটা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250