বুধবার, ২৮শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৩ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আর্জি জানিয়ে জাতিসংঘে আওয়ামী লীগের চিঠি *** মানিক পশারীর জানাজা-দাফনে বাধার অভিযোগ তদন্তে জামায়াতের কমিটি *** তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা জাপান প্রধানমন্ত্রীর *** রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার: জাতিসংঘের প্রতিবেদন *** মাও সেতুংকে নিয়ে মন্তব্যের জেরে ক্ষমা চাইলেন এমবাপ্পে, দুঃখ প্রকাশ লা লিগার *** আইজিপির বক্তব্য সরকারের জন্য বিব্রতকর: রিজভী *** বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমকে সমর্থন করে না সরকার: তথ্য উপদেষ্টা *** ‘ক্রসফায়ারের’ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স, আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে মবের শিকার হবেন না: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা *** আওয়ামী লীগের যারা ভালো মানুষ, তারা আপন ঠিকানা খুঁজে নেবেন: জামায়াত আমির

মতপ্রকাশ নাকি তথ্যসন্ত্রাস—সামাজিক মাধ্যমে নতুন বাস্তবতা

নবনীতা রায়

🕒 প্রকাশ: ০৪:৫১ অপরাহ্ন, ২৭শে এপ্রিল ২০২৬

#

দেশের জনপরিসর এখন এক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নাগরিকেরা আগের তুলনায় অনেক বেশি খোলামেলা—রাজনীতি, নীতি ও সামাজিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, মত দিচ্ছেন। এটি গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত।

তবে একই সময়ে আরেকটি বাস্তবতাও দ্রুত সামনে এসেছে—ভুয়া খবর, বিকৃত ছবি, সমন্বিত অপপ্রচার এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের বিস্তার। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই প্রবণতা কি সত্যিই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চর্চা, নাকি ধীরে ধীরে ‘তথ্যসন্ত্রাসের’ দিকে যাত্রা?

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা তৈরির ক্ষেত্রে একটি বিকৃত ছবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে—এমন অভিযোগ উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো একটি ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়লে তা খুব দ্রুত আবেগ উসকে দেয় এবং অনেক সময় বাস্তব সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

একবার গুজব ছড়িয়ে পড়লে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়; বরং নতুন গুজব, সন্দেহ ও বিভাজনকে উসকে দেয়।

এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বিষয়—সমন্বিত ভুয়া অ্যাকাউন্ট বা কথিত ‘বটবাহিনী’। দেখা যাচ্ছে, একই ধরনের বার্তা বহু অ্যাকাউন্ট থেকে একযোগে ছড়ানো হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এতে ব্যক্তিগত মতামত আর স্বতঃস্ফূর্ত থাকে না; বরং তা পরিকল্পিত কৌশলে পরিণত হয়, যার উদ্দেশ্য জনমতকে প্রভাবিত করা।

এই প্রবণতার বিস্তার এখন রাজনীতির বাইরে সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। নারী, সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী—অনেকে অনলাইন অপপ্রচার ও কুরুচিপূর্ণ আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। বিকৃত ছবি ও বিভ্রান্তিকর তথ্য মানুষের মধ্যে ভয়, রাগ ও অবিশ্বাস বাড়াচ্ছে। এর প্রভাব শুধু অনলাইনে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বাস্তব সামাজিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো এই প্রশ্নে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। ইউনিভারসাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস–এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। 

তবে ইন্টারন্যাশনাল কনভেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস–এর ১৯(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে দায়িত্বও রয়েছে—অন্যের সুনাম ক্ষুণ্ন করা, ক্ষতি করা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হলে রাষ্ট্র নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির সাধারণ মন্তব্য নম্বর ৩৪–তেও বলা হয়েছে, কোনো বক্তব্যের প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি; যদি তা অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বা সহিংসতা উসকে দেয়, তাহলে সেটি আর সাধারণ মতপ্রকাশের মধ্যে পড়ে না।

ইতিহাসও এ বিষয়ে সতর্ক করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি প্রচারণা কীভাবে মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে ঘৃণা ছড়িয়েছিল, তা বিশ্বকে কঠিন শিক্ষা দিয়েছে। আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সেই ঝুঁকি আরও দ্রুত ও ব্যাপকভাবে সামনে আসে, কারণ তথ্য ছড়াতে এখন সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট।

আইনি দৃষ্টান্তগুলোও একই ভারসাম্যের কথা বলে। ডেলফি অ্যাস ভার্সেস এস্তোনিয়া মামলায় ইউরোপীয় আদালত বলেছেন, বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্ব আছে ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করার। অন্যদিকে ব্র্যান্ডেনবার্গ ভার্সেস ওহাইও মামলায় বলা হয়েছে, শুধু আপত্তিকর বক্তব্যই যথেষ্ট নয়; বক্তব্য তখনই সীমিত করা যাবে, যখন তা সরাসরি ও তাৎক্ষণিক সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করে।

এই দুই দৃষ্টান্ত দেখায়, একদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা—দুটির মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট চালু করেছে, যেখানে বড় প্ল্যাটফর্মগুলোকে ঝুঁকি কমাতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে বলা হয়েছে। জার্মানির নেটওয়ার্ক এনফোর্সমেন্ট অ্যাক্ট–এ বেআইনি কনটেন্ট দ্রুত সরানোর বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব আইনের সমালোচনাও রয়েছে—অনেকে মনে করেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা আরও সতর্ক করে। মিশরে ২০১৩ সালে ভুয়া তথ্য ও উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়। ইন্দোনেশিয়াতে ১৯৯৮ সালের দাঙ্গা এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ক্ষেত্রেও বিভ্রান্তিকর তথ্য বড় ভূমিকা রেখেছে। এসব উদাহরণ দেখায়, অনলাইনে শুরু হওয়া ঘৃণা বাস্তব জীবনে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চ্যালেঞ্জ আরও সংবেদনশীল। অতীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ নিয়ে যে বিতর্ক ছিল, তা এখনো জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করে রেখেছে। ফলে নতুন কোনো নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ এলেই অনেকের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আবার সংকুচিত হবে কি না।

তবে বর্তমান বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে সমন্বিত ভুয়া তথ্য প্রচার, যা পরিকল্পিতভাবে জনমতকে প্রভাবিত করছে। বিশ্লেষকেরা বলেন, “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের ভিত্তি, কিন্তু তথ্য বিকৃতি সেই ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।” তার মতে, কেবল আইন নয়, নাগরিকদের তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বা ‘মিডিয়া সাক্ষরতা’ বাড়ানোও জরুরি।

মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা—কোনটি মতামত, আর কোনটি অপপ্রচার বা উসকানি। এই সীমারেখা অস্পষ্ট থাকলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে মানুষের আস্থা তৈরি হয় না।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচিত সংসদ একটি সুযোগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ—রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজ—একসঙ্গে বসে যদি গ্রহণযোগ্য নীতি তৈরি করতে পারে, তাহলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সহজ হলেও এর গুরুত্ব গভীর—আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে তথ্যের নামে যেকোনো কিছু ছড়ানো যাবে, নাকি এমন একটি পরিসর, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু তা দায়িত্বশীল ব্যবহারের মাধ্যমে অন্যের মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে?আমাদের সামনে এখন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।

মতপ্রকাশ নাকি তথ্যসন্ত্রাস

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250