ছবি: সংগৃহীত
একসময় তৈরি পোশাকশিল্প, শ্রমনির্ভর উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামকে প্রায় একই সারির অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণেও দুটি দেশের মধ্যে তুলনা ছিল নিয়মিত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই তুলনার চিত্র বদলে গেছে। ভিয়েতনাম এখন শুধু রপ্তানিতে নয়, মাথাপিছু আয়, বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন এবং বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্তির ক্ষেত্রেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকের স্বীকৃতি সেই অগ্রগতিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ১ জুলাই প্রকাশিত সর্বশেষ আয়ভিত্তিক (ইনকাম ক্লাসিফিকেশন) শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালের হিসাবে ভিয়েতনামের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম-জিএনআই) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৭০ মার্কিন ডলার। একই সময়ে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম সীমা ছিল ৪ হাজার ৬৩৬ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ ভিয়েতনাম আনুষ্ঠানিকভাবে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উন্নীত হয়েছে।
এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, বহুজাতিক কোম্পানি এবং উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ উচ্চমধ্যম আয়ের পর্যায়ে পৌঁছানো মানে একটি দেশের উৎপাদনশীলতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সক্ষমতার প্রতি বৈশ্বিক আস্থা আরও শক্তিশালী হওয়া।
অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনও বিশ্বব্যাংকের হিসাবে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ। গত দুই দশকে দেশের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হয়েছে, দারিদ্র্য কমেছে, নারীর কর্মসংস্থান বেড়েছে এবং তৈরি পোশাকশিল্প বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু এসব অগ্রগতি এখনও দেশের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়কে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের সীমায় নিয়ে যেতে পারেনি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একই সময়ে অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে হাঁটা দুই দেশের মধ্যে ব্যবধান এত দ্রুত কেন তৈরি হলো?
অর্থনীতিবিদদের মতে, এর উত্তর শুধু উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং প্রবৃদ্ধির গুণগত মানে। গত দুই দশকে ভিয়েতনাম শিল্পায়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সংস্কার করেছে। বাংলাদেশ সেই একই গতিতে এগোতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স একাধিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে, গত এক দশকে ভিয়েতনাম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনার পর বহু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান উৎপাদনের ঝুঁকি কমাতে ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল গ্রহণ করে। সেই কৌশলের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী দেশ ভিয়েতনাম।
একসময় পোশাক ও জুতা রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত দেশটি এখন স্মার্টফোন, কম্পিউটার, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ এবং উচ্চমূল্য সংযোজিত শিল্পপণ্যের বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস–এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভিয়েতনাম শুধু কম মজুরির শ্রমের ওপর নির্ভর করেনি; বরং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। এর ফলেই স্যামসাং, ইন্টেল, এলজি, ক্যানন, ফক্সকনসহ বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সেখানে বড় পরিসরে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি এখনও তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। এই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান শক্তি হলেও অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে রাখে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে রপ্তানির বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানোর বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ভিয়েতনামের সাফল্য বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। ধারাবাহিক অর্থনৈতিক সংস্কার, রপ্তানির বৈচিত্র্য, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারলে একটি দেশ তুলনামূলকভাবে অল্প সময়েও বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারে।
তার মতে, ভিয়েতনাম শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর করেনি; ইলেকট্রনিকস, প্রযুক্তিপণ্য ও উচ্চমূল্য সংযোজিত শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বন্দর, বিদ্যুৎ, সড়ক, শিল্পাঞ্চল এবং কারিগরি শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করেছে। এর সুফল এখন দেশটি পাচ্ছে।
বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে পড়ছে—এর পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এগুলোর বেশির ভাগই দীর্ঘদিনের সমস্যা, যেগুলোর সমাধানে ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি, নীতির ধারাবাহিকতার অভাব এবং বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
এর মধ্যে অন্যতম হলো বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনসিটিএডি) ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, গত এক দশকে ভিয়েতনাম ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি উৎপাদনমুখী বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে।
এই বিনিয়োগের বড় অংশ এসেছে উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প, ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত খাতে। বিপরীতে বাংলাদেশে এফডিআইয়ের বড় অংশ এসেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সেবা খাতে; উৎপাদনমুখী শিল্পে বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম।
ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশেও দুই দেশের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন এন্টারপ্রাইজ সার্ভে অনুযায়ী, বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা ভূমি প্রাপ্তির জটিলতা, কাস্টমস প্রক্রিয়ার ধীরগতি, কর প্রশাসনের জটিলতা, চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অন্যদিকে ভিয়েতনাম শিল্পপার্ক, দ্রুত অনুমোদন, 'ওয়ান-স্টপ সার্ভিস' এবং রপ্তানিবান্ধব নীতির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করেছে।
বাণিজ্যনীতিতেও ভিয়েতনাম এগিয়ে। গত দুই দশকে দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে একাধিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করেছে। ফলে তাদের পণ্য বড় বাজারে কম শুল্কে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশ এখনও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে শুল্ক সুবিধা কমে গেলে নতুন বাণিজ্য চুক্তি না হলে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও চাপের মুখে পড়তে পারে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ এবং উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া এক বিষয় নয়। এলডিসি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ আয়ের পাশাপাশি মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনা করে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস পুরোপুরি মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেলেও বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে না।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি। ভিয়েতনাম দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি শিক্ষা, প্রকৌশল শিক্ষা এবং শিল্পের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করেছে। ফলে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করার মতো দক্ষ কর্মী তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী বড় সম্পদ হলেও তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ নয়।
দ্য ইকোনমিস্ট–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভিয়েতনামের সাফল্যের মূল রহস্য শুধু কম মজুরির শ্রম নয়; বরং দক্ষ মানবসম্পদ, বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে দ্রুত সংযুক্ত হওয়া এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা। একই ধরনের মূল্যায়ন দিয়েছে ব্লুমবার্গ। তাদের মতে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন শুধু কম উৎপাদন ব্যয় নয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা এবং নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ইতিবাচক দিকও কম নয়। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি বিভিন্ন সময়ে দেশের দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় অগ্রগতি এবং তৈরি পোশাকশিল্পের সাফল্যের প্রশংসা করেছে। তবে এখন চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রবৃদ্ধিকে আরও বহুমুখী, উৎপাদনশীল এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করা।
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, এখনই তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধশিল্প, ইলেকট্রনিকস, উচ্চমূল্য সংযোজিত পোশাক, প্রকৌশল পণ্য, রাসায়নিক শিল্প ও কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্যে বিশেষ নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে।
তিনি বলেন, বন্দর, রেলপথ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, লজিস্টিকস, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি সম্ভব নয়। পাশাপাশি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী এক দশক বাংলাদেশের জন্য নির্ধারণী সময়। এই সময়ে যদি অর্থনৈতিক সংস্কার, ব্যাংক খাতের সুশাসন, করব্যবস্থার আধুনিকায়ন, রপ্তানির বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছানো অসম্ভব নয়। ভিয়েতনামের সাম্প্রতিক অর্জন তাই শুধু একটি দেশের সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তব শিক্ষা।
সম্ভাবনা থাকলেই উন্নয়ন হয় না—সঠিক নীতি, ধারাবাহিক সংস্কার, দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই একটি দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। বাংলাদেশের সামনে সেই সুযোগ এখনও রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কত দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়।
খবরটি শেয়ার করুন