শনিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** খুলনায় ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে’ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা *** মুঠোফোনের জন্যই অপ্রতিমকে হত্যা: পুলিশ *** পাকিস্তানে মসজিদে বোমা হামলায় নিহত বেড়ে ৩১, ইত্তেহাদুল মুজাহিদিনের দায় স্বীকার *** রাজধানীতে মসজিদ থেকে আটক ২৩ জনের ১১ জনকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ *** কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশে নিখোঁজ কিশোরের মরদেহ উদ্ধার *** ‘তৃণমূলের নাম–প্রতীক কেড়ে নেওয়া বিজেপির নোংরা খেলা’, আদালতে মমতা *** সব জেলা পরিষদের স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বাধ্যতামূলক করতে সরকারের নির্দেশ *** বিধ্বস্ত পরমাণু স্থাপনা ফের নির্মাণ করছে ইরান *** ‘ছেলেরে কই খুঁজব, জঙ্গলে নাকি পানিতে’—নিখোঁজ সন্তানের সন্ধান চেয়ে কুবি শিক্ষকের আহাজারি *** জার্মানিতে ‘নব্য-নাৎসিদের উত্থান’ দেখে আতঙ্কিত ইউরোপ, বদলে যাচ্ছে কি রাজনীতির সমীকরণ

গোরের ঢাকা সফরে ‘ভারত ও আওয়ামী লীগের স্বার্থও গুরুত্ব পেল’, ‘বার্তা’ নিয়ে তড়িঘড়ি দিল্লি ছুটলেন দীনেশ

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৫:৫৪ অপরাহ্ন, ২রা আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের তিন দিনের ঢাকা সফর শেষ হয়েছে গতকাল শনিবার। সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে ছিল বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা। কিন্তু সফরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে গত শুক্রবার ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে তার অনির্ধারিত বৈঠক এবং সেই বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লিতে দীনেশের আকস্মিক যাত্রা। এই দুটি ঘটনাই কূটনৈতিক মহলে নতুন প্রশ্ন ও নতুন বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে।

ভারতীয় হাইকমিশনের একটি সূত্র সুখবর ডটকমকে জানিয়েছে, শুক্রবার ৩১ জুলাই বিকেল ৫টা ৫২ মিনিটে ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের ৬ই–১১০৬ নম্বর ফ্লাইটে দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। আজ রোববার তিনি একই এয়ারলাইনসে ঢাকায় ফিরে এসেছেন। এত অল্প সময়ের জন্য দিল্লি যাওয়ার কারণ সম্পর্কে ভারত সরকার কিংবা হাইকমিশনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ধারণা, সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠকের পরপরই দিল্লির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একটি বার্তা পৌঁছে দিতেই এই তড়িঘড়ি সফর। যদিও এ দাবির পক্ষে প্রকাশ্য কোনো সরকারি তথ্য এখনো সামনে আসেনি।

সার্জিও গোর গত বৃহস্পতিবার ঢাকা পৌঁছানোর পর থেকেই সফরটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক সফরের চেয়ে ভিন্ন মাত্রা পেতে শুরু করে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর কোনো যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়নি। এমনকি পূর্বনির্ধারিত নৈশভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়। কেন এই পরিবর্তন, সে বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। কূটনৈতিক রীতিতে এমন ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না। ফলে সফরের প্রথম দিন থেকেই নানা জল্পনা শুরু হয়।

এর পরদিন শুক্রবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে সার্জিও গোরের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠক পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। বৈঠকটি পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে ছিল না। পরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কূটনৈতিক সূত্র সুখবর ডটকমকে জানায়, এটি ছিল একটি ইতিবাচক বৈঠক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কী সেই স্বার্থ, কিংবা কোন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে—তা প্রকাশ করা হয়নি।

এই নীরবতাই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ সার্জিও গোর কেবল দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূতই নন, তিনি একই সঙ্গে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতও। দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ঘনিষ্ঠভাবে একসঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছেন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের সাক্ষাৎ অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বাংলাদেশ সফরের মাঝপথে, পূর্বঘোষণা ছাড়াই এই বৈঠক এবং তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দীনেশের দিল্লি যাত্রা ঘটনাটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, এমন কোনো বৈঠক সম্পর্কে তার কাছে তথ্য নেই। বাংলাদেশ সরকারও এ বিষয়ে নীরব থেকেছে। ফলে দুই দেশের নীরবতাই কৌতূহল আরও বাড়িয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো অবশ্য সফরটিকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি বাংলা সংবাদপত্র এবং দিল্লিভিত্তিক কৌশলগত বিশ্লেষণমাধ্যমের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর, বাংলাদেশ-চীন ঘনিষ্ঠতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন ওয়াশিংটন ও দিল্লি উভয়েরই কৌশলগত নজরে রয়েছে।

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব বিশ্লেষণের পক্ষে কোনো সরকারই আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার করিডোর কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে সার্জিও গোরের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সব বিষয় প্রকাশ্যে বলা হয় না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা একান্ত বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকে।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ব্লিটজ পত্রিকার সম্পাদক সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী মনে করেন, “বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর আকস্মিক দিল্লি সফরের পেছনে একটাই কারণ থাকতে পারে। ঢাকায় সার্জিও গোরের সঙ্গে তার এমন কিছু বিষয় আলোচনা হয়েছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটি বিস্তারিতভাবে জানাতেই তিনি মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য দিল্লি গিয়েছিলেন।”

এদিকে সফরের শেষ দিনে গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর সার্জিও গোর বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেন। পরে তিনি ঢাকা ত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। কিন্তু তার সফরের আনুষ্ঠানিক বার্তার চেয়ে অনানুষ্ঠানিক ঘটনাগুলোই বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে।

দীনেশ ত্রিবেদীর আকস্মিক দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে উৎসাহও দেখা গেছে। তাদের অনেকেই এটিকে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ের ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের দাবি, গোরের ঢাকা সফরে ‘ভারত ও আওয়ামী লীগের স্বার্থও গুরুত্ব পেয়েছে’। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পর্যায়েই রয়েছে।

অন্যদিকে শনিবার এই বৈঠক নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। সিলেটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা তো ইন্ডিয়ায় বসেই কথা বলতে পারেন। তিনি (দীনেশ ত্রিবেদী) তো ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রদূত। এখানে এসে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলা যদি সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু যদি দুই দেশের কোনো বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে সেটা সরকারের সঙ্গেই হওয়া উচিত। পার্টিকুলার কোনো দেশের কোনো কূটনীতিবিদের সঙ্গে এভাবে আলোচনা আমাদের কাম্য নয়।’

শফিকুর রহমানের বক্তব্য মূলত বাংলাদেশের বিষয়ে তৃতীয় কোনো দেশের সমন্বিত কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। যদিও তিনিও বৈঠকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেননি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রাষ্ট্র। বঙ্গোপসাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, রোহিঙ্গা সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের আগ্রহ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। ফলে ঢাকায় কোনো উচ্চপর্যায়ের বিদেশি সফর এখন আর কেবল দ্বিপক্ষীয় সফর থাকে না; তা বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলেরও অংশ হয়ে ওঠে।

সার্জিও গোরের সফরও সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে তিনি বাংলাদেশে বিনিয়োগ, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার বার্তা দিয়েছেন, অন্যদিকে সফরের ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিয়েছে যে বাংলাদেশকে ঘিরে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগও সক্রিয় রয়েছে।

তবে তথ্য, কূটনৈতিক ইঙ্গিত এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য করাও জরুরি। এখন পর্যন্ত কোনো সরকারই বলেনি যে সার্জিও গোর ও দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আবার এটাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে এসব বিষয় একেবারেই আলোচনায় আসেনি। কারণ উচ্চপর্যায়ের কূটনীতির বড় অংশই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না।

তবু একটি বিষয় স্পষ্ট—সার্জিও গোরের ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সমন্বয় নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। আর সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দীনেশ ত্রিবেদীর অনির্ধারিত বৈঠক এবং তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লিতে তড়িঘড়ি যাত্রা। এই ঘটনাগুলোর পূর্ণ ব্যাখ্যা হয়তো এখনই মিলবে না। তবে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব যে আরও বেড়েছে, সার্জিও গোরের এই সফর সেটিই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

সার্জিও গোর দীনেশ ত্রিবেদী

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250