ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর আজ বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ঢাকায় পৌঁছেছেন। তিন দিনের এ সফরে তিনি অন্তর্বর্তী সময়ের পর গঠিত বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির পরিদর্শনেরও কর্মসূচি রয়েছে তার।
সার্জিও গোরের এই সফরকে ঘিরে আঞ্চলিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে অবাধ অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে বিশ্বের চার প্রভাবশালী শক্তি—ভারত, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র—‘অনেকটাই সহমত’ হয়েছে। তবে এই দাবির পক্ষে সংশ্লিষ্ট চার দেশের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা নীতিগত ঘোষণা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্জিও গোরের ঢাকা সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে দাবি করেছে দ্য ওয়াল।
তবে ভারত ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা রাশিয়া—কোনো দেশই ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগকে পুনরায় রাজনীতিতে অবাধ সুযোগ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারেরা বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানালেও আওয়ামী লীগের বিষয়ে আলাদা কোনো অবস্থান প্রকাশ করেনি।
দেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত বিষয়। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর দলটির বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রাণহানি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহারের অভিযোগে একাধিক মামলা হয়। পরে আদালতের বিভিন্ন আদেশ এবং সরকারের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
সরকারের ভাষ্য ছিল, বিচারিক প্রক্রিয়া ও জননিরাপত্তার স্বার্থে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ এ সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে।
দ্য ওয়াল–এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গোরের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চীনমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি বেইজিং সফর করেছেন। ওই সফরে অবকাঠামো, বিনিয়োগ, বন্দর উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ একাধিক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটির দাবি, এসব বিষয়ে ওয়াশিংটন বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে জানতে আগ্রহী।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, চীনের প্রস্তাবিত বাংলাদেশ–মিয়ানমার–চীন করিডর, মংলা বন্দরের উন্নয়ন এবং অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধিও আলোচনায় থাকতে পারে।
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে দ্য ওয়াল দাবি করেছে, এ বিষয়ে ভারতের কূটনৈতিক মহলে আলোচনা হয়েছে এবং সার্জিও গোরের সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তাদেরও মতবিনিময় হয়েছে। এমনকি গোরের সঙ্গে শেখ হাসিনার একাধিকবার কথা হয়েছে বলেও দিল্লিতে জল্পনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য বা নথি উপস্থাপন করা হয়নি। ভারত সরকার, যুক্তরাষ্ট্র বা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে—এমন মূল্যায়ন কূটনৈতিক মহলের। সংবাদমাধ্যমটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ দাবি করেছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, সার্জিও গোর বাংলাদেশের শীর্ষ সরকারি ব্যক্তিদের পাশাপাশি কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করতে পারেন। সফরে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ভূরাজনীতি, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগ্রহ বেড়েছে। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণ প্রকাশিত হচ্ছে। সরকার বরাবরই বলে আসছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছে এবং কোনো একটি দেশের প্রভাববলয়ে যাওয়ার প্রশ্ন নেই।
সার্জিও গোরের ঢাকা সফর সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। তবে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন কিংবা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তার সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে রয়েছে কি না, সে বিষয়ে ওয়াশিংটন বা ঢাকার পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, সার্জিও গোরের এ সফর বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা কিংবা বিশ্বের চার শক্তিধর দেশের কথিত অভিন্ন অবস্থান নিয়ে দ্য ওয়াল যে দাবি করেছে, তা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রকাশ্য নীতিগত ঘোষণার সঙ্গেও পুরোপুরি মিলে না। ফলে বিষয়টি আপাতত কূটনৈতিক সূত্রনির্ভর দাবি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
খবরটি শেয়ার করুন