শনিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩রা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** জার্মানিতে ‘নব্য-নাৎসিদের উত্থান’ দেখে আতঙ্কিত ইউরোপ, বদলে যাচ্ছে কি রাজনীতির সমীকরণ *** প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর কেন সংক্ষিপ্ত হচ্ছে *** প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বাড়িতে উঠলেন ফুটপাতে বাস করা গোলাপি বেগম *** রাজধানীতে ৪ এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের পর এবার বাসে আগুন *** দুই দেশের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পলাতক নানকের বিলাসী জীবন *** দিল্লিতে আওয়ামী লীগের বৈঠক রাত ৯টায়: দ্য ওয়াল *** তেজগাঁওয়ে মসজিদে গোপন বৈঠক, জঙ্গি সন্দেহে আটক ২৩ *** দিল্লিতে আওয়ামী লীগের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিলের গুজব, নেপথ্যে কাদের–নানকপন্থীরা? *** দ্য উইকের দাবি: দিল্লিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের বৈঠক বাতিল হলো কেন *** শেখ হাসিনা আমলের ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে ঢাকা, কী বলছে নয়াদিল্লি

সুখবর এক্সপ্লেইনার

ইসলামী ব্যাংক কি আগের অবস্থায় ফিরতে পারবে?

আহমেদ তোফায়েল

🕒 প্রকাশ: ০৩:২০ পূর্বাহ্ন, ১লা আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

দেশের ব্যাংক খাতের বৃহৎ ও শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এক নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক আর্থিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘকাল দেশের আমানতকারী ও সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক এই ব্যাংকটি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সমন্বিতভাবে রেকর্ড ১ হাজার ৩১৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকার লোকসান গুনেছে।

একসময় কোটি কোটি মানুষের সঞ্চয় ও আস্থার ঠিকানা এবং নিয়মিত মুনাফাকারী এই প্রতিষ্ঠানটির এমন পতন সুপরিকল্পিত লুটপাট, নজিরবিহীন দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের চরম অবনতির এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

সাম্প্রতিক আর্থিক পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, ইসলামী ব্যাংকের এই পতন কতটা আকস্মিক ও গভীর। গত পাঁচ বছর ধরে ব্যাংকটি মুনাফার ধারায় ছিল। বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকটি ২০২৫ সালে ১৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ১০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং ২০২৩ সালে ৬৩৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছিল। অথচ ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে এসে এই লাভের ধারা সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। ব্যাংকটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ১০ পয়সায়।

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেই ব্যাংকটি ২৮৮ কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়েছিল। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে এপ্রিল-জুন দ্বিতীয় প্রান্তিকে। এ সময়ে ১,০২৮ কোটি ২৬ লাখ টাকার লোকসান হয়। সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে এককভাবে বিচার করলেও ছয় মাসে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,৩২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি লোকসান নেমে হয়েছে ৮ টাকা ২৪ পয়সায়।

লোকসানের নেপথ্য কারণ

ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য ও বাজার বিশ্লেষণে এই রেকর্ড লোকসানের পেছনে বেশ কিছু মৌলিক কারণ উঠে এসেছে। প্রথমত, আমানতের বিপরীতে চড়া সুদে মুনাফা পরিশোধের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, খেলাপি বিনিয়োগ বা ঋণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিনিয়োগ থেকে আয় মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। তৃতীয়ত, অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকে রাখা উদ্বৃত্ত অর্থ বা বন্ড থেকে প্রাপ্ত আয়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। কিন্তু এই বাহ্যিক কারণগুলোর গভীরে লুকিয়ে আছে আরও ভয়াবহ এক অনিয়মের ইতিহাস।

ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ের মূল কারণ এস আলম গ্রুপের নাম জড়ানো বিশাল অঙ্কের বেনামি ও অনিয়মিত ঋণ। ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা হলেও এর একটি বিরাট অংশ এস আলম গ্রুপ নানা জালিয়াতি ও রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ হিসেবে বের করে নিয়েছে।

বর্তমান বাস্তবতায় এই বিপুল পরিমাণ অর্থ থেকে কোনো ধরনের আদায় বা রিটার্ন আসছে না। অথচ আমানতকারীদের জমানো টাকার ওপর চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত মুনাফা বা লভ্যাংশ ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে। একদিকে বিনিয়োগ থেকে কোনো আয় আসছে না, অন্যদিকে আমানতের মুনাফা মেটাতে গিয়ে ব্যাংকের ব্যালান্স শিট পুরোপুরি ফুটো হয়ে গেছে।

ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শরিয়াহ আইনের একটি বিশেষ বাধ্যবাধকতা সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বিপরীতে সুদ আয় হিসেবে না পেলেও তা খাতায় প্রভিশন বা আয় হিসেবে দেখাতে পারে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত হওয়ায়, যে অর্থ বা মুনাফা আদায় হয় না, সেটিকে ভুলেও আয় হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই।

ফলে এই আদায় না হওয়া অর্থকে ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে 'সাসপেন্স অ্যাকাউন্ট' বা স্থগিত হিসাবে ফেলে রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই অর্থ আয় খাতে যোগ হয় না, অথচ আমানতকারীদের ঠিকই লভ্যাংশ দিতে হয়। ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই পরিস্থিতি পরিষ্কার—বিনিয়োগের টাকা আটকে যাওয়ায় এবং শরিয়াহ নীতির কারণে তা আয় হিসেবে দেখাতে না পারায় নগদ প্রবাহ বা ক্যাশ ফ্লোতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। তবে এর একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে; ভবিষ্যতে যদি এই আটকে পড়া অর্থ বা মন্দ সম্পদ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়, তবে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়াতেও পারে।

গ্রাহকের আস্থা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ

একটি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় পুঁজি হলো তার সাধারণ আমানতকারী ও করপোরেট গ্রাহকদের আস্থা। ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে দেশের মধ্যবিত্ত, প্রবাসী এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বিগত বছরগুলোতে জোরপূর্বক মালিকানা পরিবর্তন ও ঋণের নামে লুণ্ঠনের ফলে সেই আস্থায় মারাত্মক ফাটল ধরেছিল। তা সত্ত্বেও ব্যাংকটির অন্তর্নিহিত শক্তি এতটাই প্রবল যে, সাধারণ মানুষের এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আবেগ ও নির্ভরতা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

এর প্রমাণ মিলেছে সাম্প্রতিক এক ইতিবাচক ঘটনায়। সংকটের এই মেঘের মধ্যেও গত কয়েক দিনে ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকার নতুন আমানত জমা হয়েছে। এটি পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে যে, জনগণ ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সঠিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক সংস্কার দেখতে পায়, তবে তারা পুনরায় ব্যাংকে পুঁজি বিনিয়োগ করতে দ্বিধা করবে না। ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা মনে করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি দ্রুত একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয়, তবে গ্রাহকদের মনে আস্থা আরও জোরালো হবে এবং বড় করপোরেট আমানত পাওয়ার নতুন পথ উন্মুক্ত হবে।

করণীয় কী

ইসলামী ব্যাংকের আজকের এই ১ হাজার ৩১৬ কোটি টাকার লোকসান কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; এটি বিগত বছরগুলোতে আর্থিক খাতে চলা সুশাসনের অনুপস্থিতি ও লুটপাটের অবধারিত পরিণতি। তবে এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের পথও পুরোপুরি রুদ্ধ নয়।

প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংক যে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করে এই মন্দ সম্পদ বা এস আলমের বেনামি ঋণগুলো কিনে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ নীতিমালার আওতায় এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ মূল ব্যালান্স শিট থেকে আলাদা বা অবলোপনের সুযোগ করে দিতে পারে। তৃতীয়ত, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদারকি জোরদার করে নতুন ও স্বচ্ছ পরিচালনা পর্ষদ নিশ্চিত করতে হবে।

যদি রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত এই সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করে, তবে ইসলামী ব্যাংক তার হারানো ঐতিহ্য ও গৌরব ফিরে পাবে বলে আশা করা যায়।

লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ। সাবেক কর্মস্থল: দৈনিক যায়যায়দিন, বর্তমান, দেশ রূপান্তর ও ইত্তেফাক

ইসলামী ব্যাংক

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

জার্মানিতে ‘নব্য-নাৎসিদের উত্থান’ দেখে আতঙ্কিত ইউরোপ, বদলে যাচ্ছে কি রাজনীতির সমীকরণ

🕒 প্রকাশ: ০২:২২ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাহাড়ের আত্মকথা ও মূলধারার সেতুবন্ধন: ‘নির্বাচিত নাটক: মৃত্তিকা চাকমা’

🕒 প্রকাশ: ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর কেন সংক্ষিপ্ত হচ্ছে

🕒 প্রকাশ: ১২:৫১ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বাড়িতে উঠলেন ফুটপাতে বাস করা গোলাপি বেগম

🕒 প্রকাশ: ১২:১৮ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানীতে ৪ এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের পর এবার বাসে আগুন

🕒 প্রকাশ: ১২:০৯ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

Footer Up 970x250