শনিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩রা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** জার্মানিতে ‘নব্য-নাৎসিদের উত্থান’ দেখে আতঙ্কিত ইউরোপ, বদলে যাচ্ছে কি রাজনীতির সমীকরণ *** প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর কেন সংক্ষিপ্ত হচ্ছে *** প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বাড়িতে উঠলেন ফুটপাতে বাস করা গোলাপি বেগম *** রাজধানীতে ৪ এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের পর এবার বাসে আগুন *** দুই দেশের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পলাতক নানকের বিলাসী জীবন *** দিল্লিতে আওয়ামী লীগের বৈঠক রাত ৯টায়: দ্য ওয়াল *** তেজগাঁওয়ে মসজিদে গোপন বৈঠক, জঙ্গি সন্দেহে আটক ২৩ *** দিল্লিতে আওয়ামী লীগের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিলের গুজব, নেপথ্যে কাদের–নানকপন্থীরা? *** দ্য উইকের দাবি: দিল্লিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের বৈঠক বাতিল হলো কেন *** শেখ হাসিনা আমলের ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে ঢাকা, কী বলছে নয়াদিল্লি

সুখবর এক্সপ্লেইনার

শ্রীলঙ্কা উচ্চমধ্যম আয়ের মর্যাদা পেল, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৯:৩৮ পূর্বাহ্ন, ৫ই জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

মাত্র তিন বছর আগে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কাকে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক কার্যত একটি ‘ব্যর্থ অর্থনীতির’ উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছিল, জ্বালানি ও ওষুধের সংকটে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, সরকার পরিবর্তন হয়েছিল এবং দেশটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম ঋণ পরিশোধে খেলাপি (সভরেন ডিফল্ট) হয়।

সেই দেশই এখন আবার ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় ফিরে এসেছে। অন্যদিকে, একসময় শ্রীলঙ্কার তুলনায় দ্রুত প্রবৃদ্ধির উদাহরণ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখনও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবেই রয়ে গেছে।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ১ জুলাই প্রকাশিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে শ্রীলঙ্কাকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বলেছে, ২০২৫ সালে দেশটির প্রকৃত জিডিপি (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। শিল্প খাতের পুনরুদ্ধার, পর্যটন, আর্থিক সেবা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এই উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি হয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের ব্যাখ্যায় শ্রীলঙ্কাকে ‘পুনরুদ্ধারের এক গল্প’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি বলছে, মাত্র কয়েক বছর আগে যে অর্থনীতি ধসে পড়ার মুখে ছিল, সেটিই এখন মাথাপিছু জিএনআই (গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম) ভিত্তিক উচ্চমধ্যম আয়ের সীমা অতিক্রম করেছে। তবে একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, এই অবস্থান ধরে রাখতে ধারাবাহিক সংস্কার অপরিহার্য।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কেন একই সময়ে সেই মর্যাদা অর্জন করতে পারল না? উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস জিডিপির আকার দিয়ে নয়; বরং মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় বা জিএনআই দিয়ে নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ অর্থনীতির মোট আকার বড় হলেও মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমায় না পৌঁছালে কোনো দেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের মর্যাদা পায় না।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রতি বছরের আগের ক্যালেন্ডার বছরের তথ্য ব্যবহার করে এই শ্রেণিবিন্যাস প্রকাশ করে এবং সেটিই পরবর্তী এক বছর বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশ গত এক দশকে দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত প্রবৃদ্ধির অন্যতম উদাহরণ ছিল। তৈরি পোশাক, রেমিট্যান্স এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের ওপর ভর করে অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে এগিয়েছে। কিন্তু করোনা-পরবর্তী সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ডলারের চাপ, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে সেই গতি কমে আসে। ফলে মাথাপিছু আয় প্রত্যাশিত গতিতে বাড়েনি।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা সংকটকে সামনে রেখে কঠিন কিন্তু দ্রুত সংস্কারের পথে হাঁটে। ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড (আইএমএফ)–এর ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচির আওতায় কর বাড়ানো, জ্বালানির মূল্য বাস্তবসম্মত করা, মুদ্রানীতিতে কঠোরতা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং বৈদেশিক ঋণ পুনর্গঠন শুরু হয়। এর ফলে প্রথম দিকে জনগণকে কষ্ট সহ্য করতে হলেও সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের শ্রীলঙ্কাবিষয়ক কান্ট্রি ম্যানেজার গেভর্গ সার্গসিয়ান বলেছেন, শ্রীলঙ্কা অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। তবে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী রপ্তানি বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম এমন সংস্কার অব্যাহত রাখা। একই প্রতিবেদনে আইএমএফের মিশনপ্রধান ইভান পাপাজর্জিও বলেন, বাহ্যিক ধাক্কা আসতেই পারে, কিন্তু সংস্কারের ধারাবাহিকতাই নির্ধারণ করবে শ্রীলঙ্কা দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে কি না।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতার কথা বলে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকা, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক বিনিয়োগে ধীরগতি, রপ্তানিতে সীমিত বৈচিত্র্য এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা। এসব কারণে অর্থনীতির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মাথাপিছু আয় দ্রুত বাড়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সর্বশেষ বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, কোনো দেশ উচ্চতর আয়ের শ্রেণিতে উঠতে শুধু অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয়ের ধারাবাহিক উন্নতি নিশ্চিত করতে হয়। এ কারণে একই বছরে কয়েকটি দেশ উচ্চতর শ্রেণিতে উন্নীত হলেও অনেক দেশ আগের অবস্থানেই থেকে গেছে।

এখানে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। শ্রীলঙ্কা সংকটের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। অনেকেই দেশটিকে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু তিন বছরের মধ্যে সেই দেশ আবার উচ্চমধ্যম আয়ের কাতারে ফিরে এসেছে। এটি দেখিয়ে দেয়, অর্থনৈতিক সংকট যত গভীরই হোক, কার্যকর সংস্কার এবং নীতির ধারাবাহিকতা থাকলে পুনরুদ্ধার সম্ভব।

তবে এটিও মনে রাখা দরকার, উচ্চমধ্যম আয়ের মর্যাদা পাওয়া মানেই সব সমস্যা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। রয়টার্স জানিয়েছে, শ্রীলঙ্কার সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও বাড়াতে হবে, কর আদায় জোরদার করতে হবে, রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি প্রতিষ্ঠান সংস্কার করতে হবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের নতুন চাপও দেশটির অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্যও একই ধরনের বাস্তবতা প্রযোজ্য। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। কারণ ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে উন্নীত হওয়া কেবল একটি পরিসংখ্যানগত অর্জন নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, নীতির কার্যকারিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থারও প্রতিফলন।

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন এবং এখন শ্রীলঙ্কার উচ্চমধ্যম আয়ের কাতারে প্রবেশ বাংলাদেশের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। একসময় যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করা হতো, তাদের কয়েকটি এখন নতুন স্তরে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ এখনও সেই দৌড়ে রয়েছে, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়, অর্থনীতির গুণগত রূপান্তর, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং মাথাপিছু আয়ের ধারাবাহিক উন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অর্থনীতির আকার বাড়লেও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের উচ্চ মধ্যম আয়ের তালিকায় স্থান পাওয়ার লক্ষ্য আরও পিছিয়ে যেতে পারে।

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে। সংকট এড়িয়ে যাওয়াই একমাত্র সাফল্য নয়; বরং সংকটের পর কত দ্রুত, কতটা কার্যকর এবং কতটা রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের অবস্থান নির্ধারণ করে।

তিন বছর আগে যে দেশকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ‘ধসে পড়া অর্থনীতি’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, আজ সেই দেশই উচ্চমধ্যম আয়ের কাতারে ফিরে এসেছে। আর বাংলাদেশ, তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অর্থনীতি থাকা সত্ত্বেও, কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক খাতের সুশাসন, রপ্তানির বহুমুখীকরণ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করলে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের লক্ষ্য অর্জন আরও বিলম্বিত হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সর্বশেষ শ্রেণিবিন্যাস দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটি তখনই টেকসই সাফল্যে রূপ নেয়, যখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় নীতিগত সংস্কার, সুশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং মানুষের মাথাপিছু আয়ের ধারাবাহিক উন্নতি। শ্রীলঙ্কা সেই পথে একটি ধাপ এগিয়েছে। বাংলাদেশও সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, তবে তার জন্য এখনই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর অর্থনৈতিক সংস্কারের সাহসী পদক্ষেপ।

উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

জার্মানিতে ‘নব্য-নাৎসিদের উত্থান’ দেখে আতঙ্কিত ইউরোপ, বদলে যাচ্ছে কি রাজনীতির সমীকরণ

🕒 প্রকাশ: ০২:২২ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাহাড়ের আত্মকথা ও মূলধারার সেতুবন্ধন: ‘নির্বাচিত নাটক: মৃত্তিকা চাকমা’

🕒 প্রকাশ: ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর কেন সংক্ষিপ্ত হচ্ছে

🕒 প্রকাশ: ১২:৫১ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বাড়িতে উঠলেন ফুটপাতে বাস করা গোলাপি বেগম

🕒 প্রকাশ: ১২:১৮ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানীতে ৪ এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের পর এবার বাসে আগুন

🕒 প্রকাশ: ১২:০৯ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

Footer Up 970x250