ছবি: সংগৃহীত
নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজারে পৌঁছেছে। তাদের মধ্যে কয়েক শ বিদেশি নাগরিক। গতকাল বুধবার হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ, বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে নদীতে পড়ার পর আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। প্রবল স্রোতে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
নেপালে এখন পর্যন্ত ৮২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা ও নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন। নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ পর্যটকের সংখ্যা ৫৯০। তাদের মধ্যে ৪৭৬ জন বিদেশি। অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি। দুই দেশের সংখ্যা মিলিয়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ১ হাজার ৩৮৪। তবে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান চলতে থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। রয়টার্স ও আল–জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো ঘটনাটিকে প্রায় দেড় হাজার মানুষের নিখোঁজ হওয়ার দুর্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছে।
নেপালে নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতীয়। নেপালের পর্যটন বোর্ডের হিসাবে ১৭৭ ভারতীয় নিখোঁজ রয়েছেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩, ইউক্রেনের ৫৩, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪, যুক্তরাজ্যের ৩৩ এবং কানাডার ২৫ নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। জার্মানির আটজন, সিঙ্গাপুরের ছয়জন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ছয়জনেরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এ তথ্য প্রকাশ করেছে নেপালের সংবাদপত্র কাঠমান্ডু পোস্ট।
তবে বিভিন্ন দেশের সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে নেপালের পর্যটন বোর্ডের হিসাবে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ১৩০ থেকে ১৩৩ জন নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৪৭ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। মালয়েশিয়ার অন্তত ১১ জনের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। জাপানের পাঁচ নাগরিকের খোঁজও পাওয়া যায়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার নয়জন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। আরও ১০ দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক দুর্গত এলাকায় আটকা পড়েছেন, তবে তাদের জীবিত থাকার খবর পাওয়া গেছে।
ভারতীয় নাগরিকদের বড় একটি অংশ ছিলেন কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রায়। এই পথ দিয়ে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ভারতীয় তীর্থযাত্রী তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরে যান। বন্যার সময়ও অনেকে ওই পথে ছিলেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, নিখোঁজ ভারতীয়দের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যের পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন। তাদের মধ্যে তামিলনাড়ুর বাসিন্দার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ নাগরিক নিখোঁজ থাকার তথ্য নিশ্চিত করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়ং। তাদের মধ্যে ১৫ জন ছিলেন কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রার একটি দলে। তারা সবাই ভারতীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় নাগরিক। এই দলে ১১ বছরের একটি শিশুও ছিল। রয়টার্স জানিয়েছে, ওই দলের সদস্যদের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার নিখোঁজ নয়জন নাগরিক ছিলেন একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত। তাদের মধ্যে ছয়জন একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কর্মী এবং তিনজন বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের কর্মী। তারা নেপালের রাসুয়া জেলায় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়া তাদের সন্ধানে ১১ সদস্যের একটি বিশেষ দল নেপালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশটির সংবাদমাধ্যম কোরিয়া জুংআং ডেইলি জানিয়েছে, দলটিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, অগ্নিনির্বাপক কর্মী ও পুলিশ সদস্য রয়েছেন।
এই দুর্যোগে নেপালে মৃতের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধারকাজ নতুন করে জোরদার হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নেপাল পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে বলেছেন, তল্লাশি আবার শুরু হয়েছে। আরও মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা রয়েছে।
নেপালের রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ভেসে গেছে। কোথাও কয়েক মিটার পুরু কাদার স্তর জমেছে। বহু যানবাহন ও বাড়িঘর কাদার নিচে চাপা পড়েছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
তিব্বতের গিরং এলাকাতেও একই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ পারাপারকেন্দ্র কাদা, পাথর ও পানির স্রোতে তলিয়ে যায়। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, মুহূর্তের মধ্যে বিশাল কাদার ঢল পারাপারকেন্দ্রের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন। এরপর কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত পুরো এলাকা ঢেকে ফেলে। দক্ষিণ চায়না মর্নিং পোস্টও ঘটনাস্থলের এমন ভিডিও ও ধ্বংসযজ্ঞের ছবি প্রকাশ করেছে।
প্রথম দিকে নেপালের কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে এই বন্যা হতে পারে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, সেটি আসলে ভূমিকম্প ছিল না। হিমবাহের বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ার সময় যে শক্তি তৈরি হয়েছিল, তাতেই ভূকম্পনের মতো কম্পন শনাক্ত হয়েছিল। পরে বরফ, পাথর, মাটি ও পানির বিশাল প্রবাহ নদীর দিকে নেমে আসে। সেখান থেকেই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলনের হার বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পাহাড়ি এলাকায় এ ধরনের ঝুঁকিও বাড়ছে। দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমালয় অঞ্চলের উষ্ণতা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। এতে হিমবাহের স্থিতিশীলতা কমে ভূমিধস, বরফধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
নেপালে পাঁচ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। হেলিকপ্টারে দুর্গম এলাকায় খাবার, তাঁবু ও জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। আহত ও আটকা পড়া মানুষদেরও হেলিকপ্টারে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ১২৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২০ জন বিদেশি নাগরিক।
তবে উদ্ধারকারীদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও সেতু। অনেক এলাকায় মোবাইল যোগাযোগও বন্ধ। কাদার স্তর অনেক জায়গায় এত গভীর যে সেখানে স্থলপথে পৌঁছানো কঠিন। এ কারণে হেলিকপ্টারই এখন প্রধান ভরসা।
এর মধ্যে তিব্বতের গিরং এলাকায় নতুন আরেকটি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ভূমিধসের কারণে উজানে একটি হ্রদে পানি আটকে গেছে। এই পানির চাপ বেড়ে গেলে হঠাৎ করে তা নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। চীনা কর্তৃপক্ষ এ কারণে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এতে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তাও শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নেপালে দুর্যোগ মোকাবিলার একজন পরামর্শক পাঠাচ্ছে। দেশটি নেপালকে পাঁচ লাখ ডলার সহায়তার কথাও জানিয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন দল ও সহযোগী সংস্থা ত্রাণ ও কর্মী পাঠাচ্ছে। ভারতও নেপালের দুর্গত এলাকায় ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়াও নিজ দেশের নাগরিকদের উদ্ধারে বিশেষ দল পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
দুর্যোগের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নিখোঁজদের ভাগ্যে কী ঘটেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, পুরু কাদার স্তর এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। উদ্ধারকারীরা নদীর তীর, ধ্বংসস্তূপ ও কাদার নিচে তল্লাশি চালাচ্ছেন। সময় যত যাচ্ছে, জীবিতদের উদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
তবু উদ্ধার অভিযান থামেনি। নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় সেনা, পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা একযোগে কাজ করছেন। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের খোঁজা হচ্ছে। স্বজনেরা অপেক্ষা করছেন কোনো সুখবরের জন্য। কিন্তু পাহাড়ি এই দুর্যোগের ব্যাপকতা এবং নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা উদ্ধারকারীদের কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ফলে মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
খবরটি শেয়ার করুন