ছবি: সংগৃহীত
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে নিয়ে সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরের দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। গতকাল বুধবার, ২৬ আগস্ট রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি আসিফের বক্তব্যের সমালোচনা করার পাশাপাশি তার আগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনেছেন।
রাশেদ খাঁন তার স্ট্যাটাসে আসিফ আকবরের ২০১৯ সালের একটি মামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। ওই মামলায় আদালতে আসিফ বলেছিলেন, মাথার সমস্যার কারণে তাকে মাঝেমধ্যে মদ পান করতে হয়। ২০১৯ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকার একটি আদালতে মাদক মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করার সময় আসিফের আইনজীবীর মাধ্যমে এ কথা জানানো হয়েছিল।
আদালতে তিনি বলেছিলেন, ঘাড়ের পেছনের দিকে ব্যথার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট পরিমাণ মদ গ্রহণ করেন। রাশেদ খাঁন লেখেন, ‘মাথার সমস্যার কারণে মদ পান করতে হয় বলে আদালতকে জানিয়েছিলেন গায়ক আসিফ আকবর! আমি জানি না, কখন তার মাথায় সমস্যা থাকে, আর কখন থাকে না।’
এরপর তিনি গত ২৪ মার্চ লন্ডনে সাকিব আল হাসানের জন্মদিন উদ্যাপনের প্রসঙ্গ আনেন। ওই দিন লন্ডনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক থাকা আসিফ আকবর সাকিবের ৩৯তম জন্মদিনের কেক কাটেন। প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, দুজন একে অপরকে কেক খাইয়ে দেন। আসিফ সাকিবকে ‘নবাব’ বলেও সম্বোধন করেন। ঘটনাটি নিয়ে তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল।
রাশেদ খাঁন তার স্ট্যাটাসে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘২০২৬ সালের ২৪ মার্চ সাকিব আল হাসানের জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কেক কাটতে তিনি লন্ডনে উপস্থিত হন! এই ঘটনায় আসিফ আকবর খুব সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। আমার ধারণা, মাথায় সমস্যা থাকার কারণে তিনি এই ভুল করেছেন। হয়তো পরবর্তীতে মাথা ঠিক হলে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন!’
এরপর আসিফ আকবরের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে রাশেদ খাঁন প্রশ্ন করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে নিয়ে মন্তব্য করার সময় আসিফের ‘মাথা ঠিক ছিল কি না’। সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করে আসিফ আকবর বলেন, ‘এই লোক গুম ছিলো নাকি লুকিয়ে ছিলো, আল্লাহ জানেন, স্যুট পরে এসে এখন সংবিধান শেখাচ্ছে!’ এই বক্তব্যের পরই রাশেদ খাঁন আসিফের সমালোচনায় সরব হন। তিনি লেখেন, ‘আমার প্রশ্ন হলো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে এমন বিরূপ মন্তব্যের সময় আসিফ আকবরের মাথা কি ঠিক ছিলো? প্রয়োজনে বক্তব্য দেওয়ার আগে একটু খেয়ে, মাথা ঠিক করে নিয়ে তারপরে বক্তব্য দিতেন! মাথার অসুস্থতা নিয়ে কেউ এভাবে জনসম্মুখে বক্তব্য দেয়?’
রাশেদ খাঁন আরও অভিযোগ করেন, গুমের মতো গুরুতর বিষয় নিয়ে আসিফ আকবর যে ভাষায় মন্তব্য করেছেন, তা রাজনৈতিক কটাক্ষের পর্যায়ে পড়ে। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক সমালোচনা নিয়ে আপত্তি করার প্রয়োজন নেই; কিন্তু গুম নিয়ে ‘কটাক্ষ ও প্রশ্ন’ তোলার কারণে তিনি আসিফের বক্তব্যের জবাব দিতে বাধ্য হয়েছেন।
আসিফ আকবর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গান-বাজনার পাশাপাশি রাজনীতি, ক্রিকেট ও বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন। এ কারণে তার বেশ কিছু বক্তব্য নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ক্রিকেট সম্মেলনে ফুটবল ও ফুটবলারদের নিয়ে দেওয়া তার বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন তার বক্তব্যকে আপত্তিকর ও অবমাননাকর আখ্যা দিয়ে বিসিবির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিল। পরে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এ বক্তব্যের জন্য বাফুফের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।
ওই বক্তব্যে আসিফ বলেছিলেন, জেলা পর্যায়ে ফুটবলের দখলদারত্বের কারণে ক্রিকেট খেলার মাঠ সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি ফুটবলারদের আচরণ নিয়েও মন্তব্য করেছিলেন। তার এসব বক্তব্য নিয়ে সাবেক ফুটবলার ও ফুটবল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যেও সমালোচনা দেখা দেয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৬ মে বিএনপির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেছিলেন আসিফ। নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘এখন চারদিকে শুধু বিএনপি আর বিএনপি, হাসিনা স্টাইলে দাম্ভিকতার ফাঁদে আছে দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’ তার এই মন্তব্যও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়।
২০২৬ সালেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ক্রীড়া ইস্যুতে আসিফের মন্তব্য আলোচনায় এসেছে। গত ৭ জুন ক্রিকেটের পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে তিনি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলামকে উদ্দেশ করে কঠোর ভাষায় মন্তব্য করেন। একটি পোস্টে তিনি ওই প্রতিমন্ত্রীকে ‘ফ্যাসিস্টের এজেন্ট ফুটবলার প্রতিমন্ত্রী’ বলে উল্লেখ করে দেশের ক্রিকেটব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য দায়ী করেন।
এ ছাড়া গত ৬ আগস্ট সাকিব আল হাসানকে ইঙ্গিত করে দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্ট নিয়েও আলোচনা হয়। পোস্টে কারও নাম উল্লেখ না করলেও অনেকেই সেটিকে সাকিবকে উদ্দেশ করে দেওয়া মন্তব্য হিসেবে দেখেন। সেখানে আসিফ ‘খুনির প্রমাণিত দোসর’ ও ‘ফ্যাসিস্ট’—এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করেছিলেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
তবে একই সময়ে আসিফ আকবরের বক্তব্য ও অবস্থানের মধ্যে পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। গত ২৬ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র ও যুব সংগঠন নিয়ে মন্তব্য করে বলেন, ‘এই ছাত্রদল-যুবদল কেউ থাকবে না, আমরা ছাত্রলীগ-যুবলীগও দেখছি।’ তার ভাষ্য ছিল, সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক বদলালেও সুবিধাবাদী রাজনীতির প্রবণতা থেকে যায়।
অন্যদিকে, আসিফ আকবরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ওঠা বিতর্কের মধ্যে ২০১৯ সালের মদ উদ্ধারের মামলাটিও আলোচিত। ২০১৮ সালে তার কার্যালয় থেকে চার বোতল বিদেশি মদ উদ্ধারের পর লাইসেন্স ছাড়া মদ নিজের হেফাজতে রাখার অভিযোগে ২০১৯ সালে মামলা হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে গত ৯ মার্চ ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত তাকে ওই মামলায় খালাস দেন।
রাশেদ খাঁন তার স্ট্যাটাসের শেষাংশে আসিফ আকবরের সঙ্গে তার একসময়কার ভক্তির সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ছোটবেলা থেকেই আসিফের গান তার ভালো লাগত এবং পছন্দের শিল্পীদের তালিকায় আসিফ ছিলেন। তার মতে, বিএনপির অনেক মানুষও আসিফকে গায়ক হিসেবে পছন্দ করেন।
তবে রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার কারণে শিল্পীদের জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন মন্তব্য করে রাশেদ খাঁন লিখেছেন, ‘শিল্পী বা তারকাদের কোনো দল না থাকাই শ্রেয়। আর থাকলে তিনি তো সাকিবের মতোই ঘৃণিত হবেন।’
সবশেষে আসিফ আকবরকে উদ্দেশ করে রাশেদ খাঁন লিখেছেন, ‘আমি জানি না, হঠাৎ কেন গায়ক আসিফ আকবর ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান হতে চাইলেন? তাকে তো আমরা ভালোবাসি, এই ভালোবাসার প্রতিদান এভাবে দেওয়া মোটেও উচিত হলো না, প্রিয় আসিফ আকবর ভাই!’
রাশেদ খাঁনের এই বক্তব্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রাশেদ খাঁনের বক্তব্যের বিষয়ে আসিফ আকবরের কোনো পাল্টা প্রতিক্রিয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
খবরটি শেয়ার করুন