ছবি: সংগৃহীত
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬০ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে অন্তত ১৫৭ জন এবং তিব্বতে তিনজন মারা গেছেন। তবে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা এবং দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে না পারায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় হঠাৎ এই বিপর্যয় শুরু হয়।
প্রবল স্রোতে বাড়িঘর, সড়ক, সেতু, যানবাহন ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভেসে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিমুরে ও স্যাফ্রুবেসি এলাকা। তিব্বতের সঙ্গে নেপালের গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর গিয়েরং পোর্টের আশপাশেও ব্যাপক ভূমিধস হয়েছে। এতে সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিপর্যয়ের সূত্রপাত নিয়ে প্রাথমিকভাবে যে ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো ভূমিকম্পের প্রভাবে হিমবাহের একটি অংশ ধসে নদীতে পড়ে। এতে লহেন্দে খোলা নদীতে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও কাদামাটি নেমে আসে। নদীটির পানি পরে ভোতেকোশি নদীতে প্রবাহিত হয়ে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করে।
তবে বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিশ্লেষণ এবং প্ল্যানেট ল্যাবসের উপগ্রহচিত্রে সীমান্তের কাছে তুষার ও পাথরের বড় ধরনের ধসের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এই ধসই লহেন্দে নদীতে পলি ও ধ্বংসাবশেষে ভরা আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করে থাকতে পারে।
এদিকে নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছিল। তাদের ধারণা, ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধস ও হিমবাহের কাঠামো ভেঙে পড়ে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্প, ভূমিধস এবং সম্ভাব্য হিমবাহ বা হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। আল জাজিরাও জানিয়েছে, তিব্বতের গিয়েরং এলাকায় ভূমিধসের পাশাপাশি নেপালের দিকে ব্যাপক আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে।
এই দুর্যোগে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক হিসাবে ৪৮৪ জন পর্যটক ও ভ্রমণকারীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয়, ৯৩ জন নেপালি, ১২ জন ব্রিটিশ ও তিনজন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসের নাগরিকও নিখোঁজের তালিকায় আছেন। একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত আটজন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকেরও কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীসহ উভয় দেশে নিখোঁজের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
তিব্বতের গিয়েরং কাউন্টিতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, গিয়েরং পোর্টের কাছে ভূমিধসে সড়ক, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত উদ্ধার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
উদ্ধারকাজে নেপাল পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা অংশ নিচ্ছেন। হেলিকপ্টার, ড্রোন ও নৌযান ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু অনেক এলাকায় পানি ও কাদামাটি জমে থাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার নামানো সম্ভব হচ্ছে না। চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় শত শত উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে। নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধারকাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্যার সঙ্গে আসা পলি, কাদা ও পাথরের স্তূপ।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। লহেন্দে খোলা নদীর উজানে এখনো একটি পানিপ্রবাহের বাধা রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সেটি ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায় আকস্মিক বন্যা হতে পারে। ফলে নদীর তীর ও নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নেপালের বন্যার প্রভাব পড়তে পারে প্রতিবেশী ভারতেও। দেশটির বিহার ও উত্তর প্রদেশে নদীগুলোর পানি বাড়ার কারণে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। ভারত উদ্ধার ও ত্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও ওষুধ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়াও সরকারি কর্মকর্তা, দমকল ও পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি র্যাপিড রেসপন্স দল পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে। জাতিসংঘও উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ে যুক্ত হচ্ছে।
হিমালয়ের এই অঞ্চল এমনিতেই আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও হিমবাহ-সম্পর্কিত দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এবারের ঘটনার ক্ষেত্রে ঠিক কোন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় এত অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এল, তা জানতে আরও তদন্ত প্রয়োজন। উদ্ধারকাজ এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপর্যয়ের প্রকৃত চিত্র এবং হতাহতের সংখ্যা আরও স্পষ্ট হবে।
খবরটি শেয়ার করুন