ছবি: সংগৃহীত
ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনা যখন শেষ পর্যায়ে, তখন মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরের একটি ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম লা নাসিওন–এর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)-এর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আর্থিক লেনদেন নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ এবং দেশটির প্রধান তদন্ত সংস্থা এফবিআই।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে শত শত মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক লেনদেন, যার একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়েছে ট্যুর প্রড এন্টার এলএলসি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। তদন্তটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত এএফএ বা এর কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়নি।
লা নাসিওন–এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপ চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল প্রসিকিউটর এবং এফবিআইয়ের তদন্তকারীরা সম্ভাব্য সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন। তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, এএফএ কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর করেছে এবং সেই লেনদেনগুলোর কোনো অংশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ পাচার, ব্যাংক জালিয়াতি বা আর্থিক অপরাধসংক্রান্ত আইনের আওতায় পড়ে কি না, তা নির্ধারণ করা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্যুর প্রড এন্টার এলএলসি যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে অন্তত ২৬ কোটি মার্কিন ডলার স্থানান্তর করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আবার এই অঙ্ক ৩০ কোটি ডলারেরও বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা এসব অর্থের উৎস, গন্তব্য এবং লেনদেনের যৌক্তিকতা যাচাই করছেন।
তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবসায়ী গিয়ের্মো তোফোনির সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। ইনফোবায়ে জানিয়েছে, তদন্তকারীরা তার কাছ থেকে এএফএর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কাঠামো, স্পনসরশিপ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিয়েছেন। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর প্রশাসনের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তাকেও সম্ভাব্য সাক্ষী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছেন এএফএ সভাপতি ক্লদিও চিকি তাপিয়া এবং সাধারণ সম্পাদক পাবলো তোভিগিনো। মার্কিন তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোর অর্থ কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে এবং পরে কীভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বণ্টিত হয়েছে। বিশেষভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে ট্যুর প্রড এন্টার এলএলসি–এর ভূমিকার ওপর, যে প্রতিষ্ঠানটি বিদেশে এএফএর বাণিজ্যিক আয়ের সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছিল।
স্পেনের ক্রীড়া দৈনিক মুন্দো দেপোর্তিভো লিখেছে, মার্কিন কর্তৃপক্ষের মূল প্রশ্ন হচ্ছে—এএফএর আন্তর্জাতিক স্পনসরশিপ থেকে আসা অর্থের প্রবাহ স্বচ্ছ ছিল কি না এবং কোনো লেনদেন ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল কি না, যাতে প্রকৃত অর্থের গন্তব্য আড়াল করা যায়।
ইনফোবায়ে তাদের অনুসন্ধানে আরও দাবি করেছে, কিছু ব্যাংক নথিতে দেখা গেছে অর্থ অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা বিভিন্ন হিসাবে অবস্থান করে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে। আর্থিক অপরাধ তদন্তে এমন দ্রুত অর্থ স্থানান্তরের ধরণকে প্রায়ই বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হয়। তবে এমন লেনদেন মানেই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না; সেটি নির্ভর করে লেনদেনের উদ্দেশ্য, চুক্তি এবং প্রমাণের ওপর।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, তদন্তটি শুরু হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি। লা নাসিওন এবং পরে ত্রিবুনা ডটকম–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এএফএর প্রতিনিধিরা জোর দিয়ে বলেছেন যে তদন্ত মানেই অপরাধ প্রমাণ নয় এবং আইনের চোখে প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নির্দোষ থাকার অধিকার রয়েছে, যতক্ষণ না আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হয়।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রশাসন বিশ্লেষকেরা বহু বছর ধরেই বলে আসছেন, বিশ্ব ফুটবলে বিপুল অঙ্কের বাণিজ্যিক অর্থ প্রবাহের কারণে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্স ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, আর্জেন্টিনায়ও এএফএ ও কয়েকটি ক্লাবকে ঘিরে অর্থ পাচারসংক্রান্ত পৃথক তদন্ত হয়েছিল। ফলে বর্তমান মার্কিন তদন্তকে অনেক পর্যবেক্ষক বৃহত্তর আর্থিক নজরদারির অংশ হিসেবে দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফেডারেল প্রসিকিউটরদের মন্তব্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রায়ই উঠে এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিদেশি হলেও মার্কিন বিচার বিভাগের এখতিয়ার তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই এই তদন্ত আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমান তদন্তেও সেই আইনি ভিত্তিই যাচাই করা হচ্ছে।
বিশ্বকাপের মাঝখানে এই তদন্ত সামনে আসার সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মাঠে আর্জেন্টিনা একের পর এক জয় তুলে নিচ্ছে। শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ গোলে নাটকীয় জয় পেয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে দলটি। কিন্তু একই সময়ে মাঠের বাইরে প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রশ্নে এএফএকে ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে।
মিসরের বিপক্ষে ম্যাচ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রেফারিং নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মিসরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান এবং ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো। যদিও এই বিতর্কের সঙ্গে আর্থিক তদন্তের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই, তবু বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন মাঠ ও মাঠের বাইরের দুটি ভিন্ন ইস্যুই রয়েছে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত চলছে, কিন্তু অপরাধ এখনো প্রমাণিত হয়নি। মার্কিন বিচার বিভাগ ও এফবিআই সাক্ষ্য, ব্যাংক নথি এবং আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে এটি কেবল একটি প্রাথমিক অনুসন্ধান হিসেবেই শেষ হবে, নাকি আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি মামলায় রূপ নেবে।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে ফিফা গেট–এর মতো দুর্নীতিকাণ্ড দেখিয়েছে যে, ক্রীড়া প্রশাসনের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক। সেই প্রেক্ষাপটে এএফএকে ঘিরে চলমান তদন্তও কেবল একটি দেশের ফুটবল সংস্থার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রশাসনে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং আর্থিক সুশাসনের প্রশ্নকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে মার্কিন তদন্তকারীদের পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই বহুল আলোচিত অভিযোগ শেষ পর্যন্ত কতটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
খবরটি শেয়ার করুন