দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের চার মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশের অর্থনীতি যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও অর্থনীতিবিদদের আগ্রহ ছিল স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শিরোনামের এ বাজেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—এতে কেবল রাজস্ব আহরণ বা ব্যয় ব্যবস্থাপনার হিসাব-নিকাশ নয়, বরং অর্থনীতিকে নতুনভাবে পুনর্গঠনের একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতায় যেমন ছিল সংস্কার, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষার প্রসঙ্গ; তেমনি বাজেটের বিভিন্ন প্রস্তাবেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানুষের প্রত্যাশা সামাল দেওয়া। গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। ফলে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনগণের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল স্বস্তির কিছু পদক্ষেপ। প্রস্তাবিত বাজেটে নিত্যপণ্যের উৎসে কর হ্রাস, কৃষি উপকরণে কর অব্যাহতি, ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য সুবিধা বৃদ্ধি এবং করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সেই প্রত্যাশা পূরণের প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ওপর কর ও শুল্ক কমানোর উদ্যোগকে ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হলে বাজারে সরবরাহ ব্যয় কিছুটা কমতে পারে, যার সুফল ভোক্তারা পেতে পারেন। যদিও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা থাকলে কর হ্রাসের পুরো সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যেও বাজেটে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফ্রিল্যান্সার, স্টার্টআপ উদ্যোক্তা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য কর ছাড় ও প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি ইতিবাচক সংকেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি গত এক দশকে দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। সেই বাস্তবতায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে প্রযুক্তি খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেক অর্থনীতিবিদ সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেছেন।
পরিবেশবান্ধব উন্নয়নকে উৎসাহিত করার বিষয়টিও বাজেটে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য কর সুবিধা ও প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব ভবিষ্যতমুখী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক বার্তা বহন করবে বলে মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতেও বরাদ্দ বৃদ্ধি বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং শিক্ষা খাতে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ নতুন সরকারের অগ্রাধিকার সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দেয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। সেই বিবেচনায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়। তবে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, বাজেটের সবচেয়ে ইতিবাচক দিকগুলোর একটি হলো সংস্কার কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়া। কর প্রশাসন আধুনিকীকরণ, কাস্টমস ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর, বন্ড ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারকে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার সমাধানের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতি বহু বছর ধরে নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত, দুর্বল রাজস্ব প্রশাসন এবং আর্থিক খাতের অনিয়মের কারণে ভুগছে। ফলে এসব ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হতে পারে।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় রাজনৈতিকভাবেও এটি তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের একটি রূপরেখা ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে অংশগ্রহণমূলক প্রবৃদ্ধি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদে বিনিয়োগের বিষয়গুলো সামনে আনা হয়েছে। এতে সরকার অর্থনীতিকে শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে নয়, বরং কর্মসংস্থান ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখতে চায়—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তবে ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি সমালোচনাও রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, বাজেটে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জনের বাস্তব কৌশল যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জিং। জ্বালানি ব্যয়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের চাপ বিবেচনায় এসব লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো বাজেটের ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা। বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করতে পারে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনও পুরোপুরি গতি ফিরে না পাওয়ায় এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু করহার বৃদ্ধি নয়, করজাল সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে।
কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ না রাখার সিদ্ধান্তটি অনেকের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে এসেছে। সুশাসন ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষকরা। তবে দীর্ঘমেয়াদে দুর্নীতি ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ রোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও সংস্কার ভাবনার একটি প্রাথমিক রূপরেখা হিসেবে দেখা যায়। এতে জনস্বার্থ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রযুক্তি, পরিবেশ এবং মানবসম্পদে বিনিয়োগের ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চ ঘাটতি, ঋণনির্ভরতা এবং রাজস্ব আহরণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে বক্তৃতার ভাষা বা ঘোষণার আকর্ষণের ওপর নয়; বরং সরকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সংস্কার কর্মসূচির কার্যকর প্রয়োগের ওপর। যদি ঘোষিত উদ্যোগগুলো বাস্তবে রূপ পায়, তাহলে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন