শনিবার, ২৪শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৯ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৪০৭ বিদেশি, সাজা শেষে ফেরার অপেক্ষায় ১৭২ *** সাজেক সড়কে অবরোধ অব্যাহত, রিসোর্টের ৬০ শতাংশ বুকিং বাতিল *** দ্রুততম মানব ইমরানুর, মুকুট ধরে রাখলেন শিরিনও *** ১৩ বছর বয়সী ছাত্রীকে ধর্ষণে সহায়তা করেছিলেন মাদ্রাসাশিক্ষকের স্ত্রী, গ্রেপ্তার *** কোনো কিছুই পক্ষে নেই, কেন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি সৌদি যুবরাজ *** ‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন’ জানিয়ে নওগাঁয় মাইকিং *** ছাত্রীকে যৌন হয়রানির খবরে মহিলা মাদ্রাসায় আগুন, শিক্ষককে পুলিশে সোপর্দ *** ১৩ বছর বয়সী ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, মাদরাসা শিক্ষক পলাতক *** টঙ্গীতে শিশুকে যৌন নিপীড়ন: মাদ্রাসাশিক্ষককে থাপ্পড়ের ভিডিও ভাইরাল, থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ *** বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্টের আগে সুখবর দিল বিসিবি

‘সরকারের বিরুদ্ধে কেউ যেন কথা বলতে না পারে—ধারণা দেওয়ার চেষ্টা চলছে’

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০১:৪৪ পূর্বাহ্ন, ২২শে এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

যে কোনো সরকারের সময় সমালোচনা বা ভিন্নমত প্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে আসে—এমন বাস্তবতা দেশে নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট বা কনটেন্ট শেয়ারকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক গ্রেপ্তার, আইন প্রয়োগের ধরন এবং তার প্রেক্ষাপট নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন অধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকেরা।

মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিক্ষোভ সমাবেশে টানানো একটি ফেস্টুনে লেখা ছিল—‘কথা চলবে, কলম চলবে’। এ স্লোগান একটি প্রতীকী প্রতিচ্ছবি। কনটেন্ট ক্রিয়েটর এ এম হাসান নাসিমের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত ওই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা মতপ্রকাশের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেন।

হাসান নাসিমকে ১৮ এপ্রিল গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিযোগ, তিনি ফেসবুকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলামকে নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার করেছেন। তবে বিক্ষোভকারীদের দাবি, একটি কার্টুন শেয়ার করার কারণেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন। কিন্তু এই গ্রেপ্তার ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়।

শুধু এই একটি ঘটনা নয়, গত এক মাসে অন্তত চারজনকে বিভিন্ন আইনে—ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং সাইবার সুরক্ষা আইনে—গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও একজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনাই সম্মিলিতভাবে একটি প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ২৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে আজিজুল হক নামে এক ব্যক্তিকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি নিজে পোস্টটি তৈরি করেননি, বরং একটি পেজ থেকে দেওয়া পোস্ট শেয়ার করেছিলেন। পরদিন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

ভোলায় আরেক ঘটনায় সরকারবিরোধী পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে বিবি সওদা নামের এক নারীকে একই ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বিষয়টি আলোচনায় এলে তাকে জামিন দেওয়া হয়।

এই ঘটনাগুলোর পর প্রশ্ন উঠেছে—শেয়ার করা কনটেন্ট বা মতামতের কারণে গ্রেপ্তার কতটা যৌক্তিক এবং আইনের প্রয়োগ কতটা সঙ্গত।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা পুলিশকে পরোয়ানা ছাড়াই কাউকে আটক করার ক্ষমতা দেয়। দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ধারার অপব্যবহারের অভিযোগ করে আসছে। বিশেষ করে ‘প্রতিরোধমূলক আটক’ হিসেবে এই ধারা ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই ধারায় সংশোধন আনা হয়। সংশোধনী অনুযায়ী, আমলযোগ্য অপরাধে কাউকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করতে হলে পুলিশকে দেখাতে হবে যে অভিযুক্ত ব্যক্তি পুলিশের সামনে অপরাধ করেছেন অথবা তার বিরুদ্ধে যুক্তিসংগত সন্দেহের কারণ রয়েছে। শুধু প্রতিরোধমূলক কারণে গ্রেপ্তার করার সুযোগ নেই।

তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে এই সংশোধনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই গ্রেপ্তারের সময় স্পষ্ট কারণ জানানো হয় না এবং আইনি শর্ত পূরণ করা হয় না।

দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। গত দেড় দশকে বিশেষ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে মামলা ও গ্রেপ্তারের প্রবণতা দৃশ্যমান ছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা প্রথমে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। পরে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়, যা আরও বিস্তৃত পরিসরে ব্যবহৃত হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই আইনে ৭ হাজার ১টি মামলা হয়েছিল বলে জাতীয় সংসদে জানানো হয়।

ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২০২৩ সালে এই আইন বাতিল করে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেটিও বাতিল করে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ জারি করে।

তবে আইন পরিবর্তন হলেও বাস্তব চিত্রে তেমন পরিবর্তন আসেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, আইনের নাম বদলালেও প্রয়োগের ধরন একই রয়ে গেছে।

১৭ এপ্রিল হাসান নাসিমকে আটকের পর গুলশান থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই ঘটনায় সংসদে প্রশ্ন তোলেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, একটি কার্টুন শেয়ার করার জন্য গ্রেপ্তার—এটি অস্বাভাবিক এবং উদ্বেগজনক।

এর আগে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ বাজানোর ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিকে গ্রেপ্তার করা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলায় তিনি এখনো কারাগারে রয়েছেন।

এই ঘটনাগুলো মিলিয়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র কি অনলাইন মত প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন কাঠামো তৈরি করছে?

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন মনে করেন, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার ভাষায়, “সরকারের বিরুদ্ধে যেন কেউ কথা বলতে না পারে—এমন একটি ধারণা তৈরি করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, আইনি কাঠামোর মাধ্যমে এই বিষয়গুলো মোকাবেলার চেষ্টা করলে সমাজে প্রশ্ন করার বা সমালোচনা করার স্বাভাবিক অধিকার সংকুচিত হয়ে যায়।

অধিকারকর্মীদের মতে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই একদিনে সীমিত হয় না; এটি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলেই তারা মনে করছেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনেকের মধ্যে আশা তৈরি হয়েছিল যে মত প্রকাশের ক্ষেত্র আরও উন্মুক্ত হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার ও আইনের প্রয়োগ সেই আশাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নাগরিকের মত প্রকাশের অধিকারও গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি মৌলিক উপাদান। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না হলে সংকট তৈরি হয়।

মতপ্রকাশের অধিকার

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250