ছবি: সংগৃহীত
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের দর্শন ও ঘোষণাগুলোকে আশাব্যঞ্জক আখ্যা দিলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, বাজেটের সাফল্য নির্ধারণ হবে কাগজে-কলমের প্রতিশ্রুতিতে নয়, বরং তা সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তার ওপর। সুখবর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি এমন অভিমত ব্যক্ত করেন।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি, মানবিক সমাজ এবং গণতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা নীতিগতভাবে ইতিবাচক। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে বাস্তব পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তিনি বলেন, বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাসহ জনকল্যাণমূলক খাতে মোট বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক রাখা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য অংশ থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। এতে বরাদ্দকৃত অর্থের প্রকৃত ব্যবহার, অগ্রাধিকার এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
ড. দেবপ্রিয়ের ভাষায়, “যখন একাধিক ক্ষেত্রে থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—এই অর্থ আদৌ বাস্তবে পাওয়া যাবে কি না, অথবা সরকার এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি অর্থ কীভাবে ব্যয় করবে। ফলে বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি প্রসঙ্গেও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক এবং প্রয়োজনীয় হলেও এ ধরনের ব্যয়ের জন্য স্পষ্ট খাতভিত্তিক বরাদ্দের পরিবর্তে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি করে।
রাজস্ব নীতির ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, নতুন সরকারকে ঘিরে অনেকের প্রত্যাশা ছিল আয়করের পাশাপাশি সম্পদ কর, উত্তরাধিকার কর কিংবা উচ্চ সম্পদশালীদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের মতো প্রগতিশীল ব্যবস্থা বিবেচনা করা হবে। কিন্তু বাজেটে সে ধরনের কোনো বড় উদ্যোগ দেখা যায়নি।
বরং সীমিত পরিসরে অঘোষিত আয় নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। যদিও সরকার জমি ও আবাসন খাতে দলিল মূল্য এবং প্রকৃত লেনদেন মূল্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবধান দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে, তবু বিষয়টি বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয় বলে মনে করেন তিনি।
তবে ইতিবাচক দিক হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, অতীতের মতো প্রকাশ্যে কালো টাকা সাদা করার বড় ধরনের সুযোগ এবারের বাজেটে রাখা হয়নি। তার মতে, এটি প্রশংসনীয় এবং করনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি ইতিবাচক বার্তা।
ড. দেবপ্রিয়ের অন্যতম বড় উদ্বেগ কর কাঠামোর চরিত্র নিয়ে। তার মতে, অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে সরকার এখনো প্রধানত পরোক্ষ করের ওপর নির্ভর করছে। ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন খাতে নতুন ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে ধনী ও দরিদ্র উভয়কেই একই হারে করের বোঝা বহন করতে হবে।
তিনি বলেন, “একজন উচ্চ আয়ের ব্যক্তি এবং একজন নিম্ন আয়ের মানুষ একই হারে ভ্যাট দেন। ফলে এই কর ব্যবস্থা সামাজিক বৈষম্য কমানোর বদলে অনেক ক্ষেত্রে তা বাড়িয়ে দিতে পারে।”
রাজস্বের নতুন উৎস অনুসন্ধানে সরকারের উদ্যোগ সীমিত বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, গত এক যুগে দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ পাচার হয়েছে, তা পুনরুদ্ধারকে রাজস্ব নীতির অংশ করা যেত। বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের একটি অংশ ফেরত আনার সম্ভাবনা নিয়েও বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
“বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া সম্পদ উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা যেত। কিন্তু এ বিষয়ে বাজেটে কোনো প্রাক্কলন বা কৌশল দেখা যায়নি,” বলেন তিনি।
অবশ্য বাজেটে ইতিবাচক উদ্যোগও রয়েছে বলে স্বীকার করেন ড. দেবপ্রিয়। প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য কর সুবিধা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি খাতে উৎসাহমূলক ব্যবস্থাগুলোকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন।
তবে তার প্রশ্ন, সামগ্রিক বাজেট কাঠামোর মধ্যে এসব সুবিধার প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে এবং তা অর্থনীতির বৃহত্তর চিত্রে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে। বাজেটের অর্থায়ন কাঠামো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সিপিডির এই ফেলো। তার মতে, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রবণতা দেখা যায়—প্রথমে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়, পরে সেই ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আয়ের হিসাব দাঁড় করানো হয়। ফলে অর্থনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিবেচনাই অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায়।
ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণের ওপর বাড়তি নির্ভরতার পরিকল্পনাকেও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মধ্যম মাত্রার ঋণগ্রস্ত দেশের অবস্থানে রয়েছে। এ অবস্থায় প্রায় সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক অর্থায়নের পরিকল্পনা ভবিষ্যতে ঋণনির্ভরতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষ করে এই অর্থের একটি বড় অংশ যদি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিবর্তে বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা চলতি ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ড. দেবপ্রিয়ের মতে, বাজেটের ঘোষিত মানবিক ও গণতান্ত্রিক অর্থনীতির দর্শনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভর অর্থায়নের সামঞ্জস্য নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
তবে তিনি সরকারের কিছু নীতিগত পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবেও মূল্যায়ন করেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কমানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
কর ও শুল্ক ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরির উদ্যোগকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন ড. দেবপ্রিয়। তার মতে, এক বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছরের কর কাঠামো সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া হলে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে সুবিধা পান এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার ওপর আস্থা বাড়ে।
তবে সবশেষে তিনি জোর দেন বাস্তবায়নের ওপর। তার ভাষায়, “মিষ্টির স্বাদ যেমন খাওয়ার পর বোঝা যায়, তেমনি বাজেটের গুণাগুণও বোঝা যাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে।”
তিনি মনে করেন, টাকা বরাদ্দ দেওয়া এবং মানুষের প্রকৃত উপকার হওয়া এক বিষয় নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, এই বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে কি না।
এক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা নয়, জনগণের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি, তরুণদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান উদ্যোগ কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তাদের সহায়তার মতো কর্মসূচিতে স্থানীয় জনগণ, নাগরিক সমাজ ও উপকারভোগীদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা গেলে কার্যকারিতা আরও বাড়বে বলে তার মত।
ড. দেবপ্রিয়ের মতে, বর্তমান বাজেটে রাজনীতি, প্রশাসনিক কাঠামো এবং উন্নয়নের ভাষ্য রয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ভবিষ্যতে সামাজিক সংগঠন, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং নাগরিকদের সক্রিয় সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাজেট বাস্তবায়ন ও তদারকির সুযোগ বাড়ানো গেলে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সবশেষে তিনি সতর্ক করে বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ এবং সংসদে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রতিবেদন উপস্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অতীতের ভুল ও অদক্ষতার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকে যাবে।
তার কথায়, “বাজেটের দর্শন আশাব্যঞ্জক। কিন্তু সেই দর্শনের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। আর বাস্তবায়ন কতটা মানুষের জীবনকে স্পর্শ করতে পারে, সেটিই হবে এই বাজেটের চূড়ান্ত মানদণ্ড।”
খবরটি শেয়ার করুন