ছবি: সংগৃহীত
দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেছেন, আমি কি এই সাংবাদিকতা চেয়েছিলাম! যেখানে সম্পাদকেরা চলেন গানম্যান নিয়ে। পত্রিকা অফিস পাহারা দেয় পুলিশ। এটা কোন সাংবাদিকতা? এটা তো কোনো রণাঙ্গন নয়। তথ্য মন্ত্রণালয় দেশে অনুগত সাংবাদিক বাহিনীর জন্ম দিয়েছে। যার মূল্য অনেকেই দিচ্ছেন এখন।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের কেউ জেলখানায়, অনেকেই পলাতক। কেউ কেউ খুব কষ্টে জীবন-যাপন করছেন। না পাচ্ছেন চাকরি, না পাচ্ছেন সামাজিক মর্যাদা। তবুও সাংবাদিকতার বাইরে অন্য কিছু আমাকে আকৃষ্ট করে না। বহুবার লিখেছি, আজও লিখছি। আমার কিন্তু সাংবাদিক হওয়ার কথা ছিল না। কথা ছিল বিলেত প্রবাসী হওয়ার। সাংবাদিকতার নেশায় জীবনে কখনো আপসের চোরাগলিতে হাঁটিনি।
তিনি বলেন, তারেক রহমান (বিএনপির চেয়ারম্যান) দেশে ফেরার আগে বিএনপির আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে খোলামেলাই বলেছিলাম- তথ্য মন্ত্রণালয় রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। ব্রিটেনসহ পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে এই মন্ত্রণালয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অনেকটা কলঙ্কজনক। প্রশ্ন উঠতে পারে তথ্য মন্ত্রণালয় না থাকলে মিডিয়ার দেখভাল করবে কে? একটি মিডিয়া রেগুলেটরি কমিশন এর দায়িত্ব নিতে পারে। যা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছে।
'সাংবাদিক পরিচয়েই মরতে চাই' শিরোনামে প্রকাশিত একটি বিশেষ নিবন্ধে মতিউর রহমান চৌধুরী এসব কথা বলেন। তার লেখাটি গতকাল মঙ্গলবার (১৩ই জানুয়ারি) মানবজমিনের ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটির লিংক ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সাংবাদিক সমাজসহ নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনদের মধ্যে লেখাটি নিয়ে নানামুখী আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে।
তারা বলছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের অনেক সাংবাদিক ও গণমাধ্যম যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, মতিউর রহমান চৌধুরীর বক্তব্যে তা ফুটে উঠেছে। প্রসঙ্গত, জুলাই অভ্যুত্থানের পর হত্যা ও সহিংসতা মামলার বেড়াজালে জড়িয়ে আছে অন্তত ২৯৮ জন সাংবাদিকের নাম। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাইয়ে নিহতদের ত্যাগের বিচার প্রতিষ্ঠার বদলে মামলাগুলো এখন রাজনৈতিক লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
অনেক সাংবাদিক ওই সময় গ্রেপ্তার, চাকরিচ্যুত হন। অনেকে আছেন কারাগারে, না হয় আত্মগোপনে। এছাড়া গত ডিসেম্বরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সংগঠিত সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয় দেশের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো। একই সঙ্গে হামলার শিকার হয়েছে শীর্ষ ইংরেজি সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টারও। সন্ত্রাসীরা ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউতে ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় কার্যালয় দুটি।
হামলার শুরু হলে প্রথম আলোর সাংবাদিক ও কর্মীরা প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত কার্যালয় ত্যাগ করেন। হামলার কারণে কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ায় পরদিন প্রথম আলো প্রকাশিত হয়নি। এতে প্রতিষ্ঠার ২৭ বছরে প্রথমবারের মতো সংবাদপত্রের ছুটি বাদে এক দিনের জন্য প্রথম আলোর প্রকাশনা বন্ধ থাকে।
প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণের কার্যক্রম বন্ধ ছিল প্রায় ১৭ ঘণ্টা। ঢাকার বাইরে কুষ্টিয়া, খুলনা ও সিলেটে প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর হয়। চট্টগ্রাম, বগুড়া ও বরিশাল কার্যালয়েও হামলার চেষ্টা হয়।
পত্রিকা প্রকাশ করতে পারেনি ডেইলি স্টারও। তাদের অনলাইন সংস্করণের কার্যক্রমও দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষ বলেছে, সংবাদপত্রের ছুটি ছাড়া ৩৩ বছরের ইতিহাসে তাদের প্রকাশনা বন্ধের ঘটনাও এই প্রথম। হামলার সময় ডেইলি স্টার–এর ২৮ জন সাংবাদিক ও কর্মী ছাদে আটকা পড়েছিলেন।
খবরটি শেয়ার করুন