ছবি: সংগৃহীত
নতুন গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ এখন ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রথমবার নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে বারবার প্রক্রিয়াগত ভুল ও অনভিজ্ঞতার লক্ষণ দেখা দেওয়ায় আইন প্রণয়নের কার্যকারিতা, শৃঙ্খলা এবং জনসাধারণের অর্থের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রথম অধিবেশন যত এগোচ্ছে, অনিয়মিত আচরণের একটি ধারা ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জাতীয় সংসদের স্পিকারকে অনানুষ্ঠানিকভাবে সম্বোধন করা, পূর্ব লিখিত নোটিশ ছাড়াই বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা, নির্ধারিত আলোচ্যসূচি থেকে বিচ্যুতি এবং নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করার মতো ঘটনাগুলো স্পিকারের বারবার হস্তক্ষেপের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এসব ঘটনা সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলছে।
সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে নতুন সদস্যদের অস্বাভাবিক উচ্চ সংখ্যা। ৩০০ এমপির মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি—মোট ২১৯ জন, যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতাও আছেন—প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম অভিজ্ঞ সংসদগুলোর একটি।
প্রথমে এই নতুন মুখগুলোর আগমনকে প্রজন্মগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হলেও বিশ্লেষকেরা এখন সতর্ক করছেন যে সংসদীয় নিয়ম সম্পর্কে অপরিচিতি দ্রুত সমাধান না হলে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হতে পারে।
প্রাথমিক কিছু প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী জোট জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যরা এখনও সংসদীয় প্রক্রিয়া বুঝে উঠতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচির অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অষ্টম সংসদ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সদস্যদের সংসদীয় কার্যপ্রণালী শেখাতে সক্রিয় ছিল। তবে গত চারটি সংসদে এ ধরনের উদ্যোগ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে, ফলে অনেক নতুন এমপি পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়াই সংসদে এসেছেন। এর প্রভাব এখন সংসদ কক্ষে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
সাম্প্রতিক অধিবেশনগুলোতে অনেক সদস্য বিধি ৭১ না মেনে—যেখানে পূর্ব লিখিত নোটিশ প্রয়োজন—বক্তব্য দিতে চেয়েছেন। আবার বিধি ৭০, যা মূলত পয়েন্ট অব অর্ডারের জন্য, তা রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বিধি ৩০০ লঙ্ঘন করে স্পিকারের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি।
এ ছাড়া সময়সীমা ও আলোচ্যসূচি মেনে চলার বিধি ৫৮ থেকে ৬০ পর্যন্ত বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে। বিধি ২৬৭ অনুযায়ী অশালীন ভাষা নিষিদ্ধ হলেও মাঝে মাঝে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিতর্কিত মন্তব্য শোনা গেছে, যা পরে কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
চলতি অধিবেশনে কয়েকটি ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ৮ এপ্রিল মৌলভীবাজার-৪ আসনের এক সদস্য অতিরিক্ত সময় চেয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে “ভাই” বলে সম্বোধন করেন। স্পিকার রসিকতার সুরে তাকে এক মিনিট অতিরিক্ত সময় দিলেও যথাযথ ভাষা ব্যবহারের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
এর আগে ১৫ মার্চ বরগুনা-১ আসনের এক সদস্যকে লিখিত বক্তব্য হুবহু পড়ে শোনানোর জন্য সতর্ক করা হয়। একই দিনে কয়েকজন সদস্যকে সহকর্মীদের অনানুষ্ঠানিকভাবে সম্বোধন না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
১৫ এপ্রিল মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের এক সদস্য নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর মাইক বন্ধ করে দেওয়া হলেও দুই মিনিটের বেশি সময় উচ্চস্বরে বক্তব্য চালিয়ে যান। ডেপুটি-স্পিকার কায়সার কামালের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি থামেননি, যা উপস্থিতদের মধ্যে হাসির সৃষ্টি করে। যদিও এসব ঘটনা অনেক সময় হাস্যরসের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তবুও এগুলো শৃঙ্খলা ও প্রস্তুতির ঘাটতির গভীর সমস্যা তুলে ধরেছে।
বিষয়টি আর্থিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা ব্যয়বহুল। একাদশ সংসদের প্রথম ২২টি অধিবেশনে প্রতি মিনিটে গড় ব্যয় ছিল প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা।
এই হিসাবে বর্তমান অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনার জন্য ব্যয় হতে পারে প্রায় ৮১.৭ কোটি টাকা। ফলে এত ব্যয়বহুল প্ল্যাটফর্মে সময় অপচয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, নতুন সদস্যদের সংখ্যার কারণে এই পরিস্থিতি অপ্রত্যাশিত নয়, তবে দ্রুত সংশোধনমূলক পদক্ষেপ জরুরি। তার মতে, রাজনৈতিক দল ও সংসদ সচিবালয়কে সমন্বিতভাবে অভিজ্ঞদের মাধ্যমে কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।
এমন উদ্যোগের আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। সরকার ও বিরোধী দলের হুইপরা ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি আয়োজনের কথা ভাবছেন, আর সংসদ সচিবালয়ও আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করছে। অতীতে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সংসদ সচিবালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে এ ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
ডেপুটি-স্পিকার কায়সার কামাল ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি শেখার একটি প্রক্রিয়া। স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত তরুণ সদস্য এই সংসদে রয়েছেন এবং অনেকেই প্রথমবারের মতো সংসদীয় প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি বলেন, “সৎ ভুলগুলোকে খুব কঠোরভাবে দেখা উচিত নয়,” এবং আশা প্রকাশ করেন সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
তবে অনেকে মনে করেন, শুধু সময়ই যথেষ্ট নয়। ক্ষমতাসীন দলের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান জানান, স্পিকারের মাধ্যমে সংসদীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, অনেক নতুন এমপি আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অপরিচিত, যা সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তা চলতেই থাকবে।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের তিনবারের এমপি গাজী নজরুল ইসলামও একই মত দেন। তার মতে, অনেক সদস্য আইন না বুঝেই কথা বলছেন, যা সংসদের কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি করছে।
সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচির প্রস্তুতি চলছে এবং শিগগিরই তা শুরু হতে পারে।
বর্তমানে সংসদ একটি পরিবর্তনশীল পর্যায়ে রয়েছে—নতুন নেতৃত্বের সম্ভাবনা ও অনভিজ্ঞতার চ্যালেঞ্জের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে। প্রশিক্ষণ, কঠোর নিয়ম প্রয়োগ কিংবা সময়—যেকোনো উপায়ে পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়া যাবে কিনা, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
খবরটি শেয়ার করুন