ছবি: সংগৃহীত
কোরবানির ঈদ যত ঘনিয়ে আসে, দেশের পশুর বাজারকে ঘিরে ততই সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র। খামারি, পশুখাদ্য ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, কসাই থেকে শুরু করে অস্থায়ী শ্রমবাজার—সব মিলিয়ে তৈরি হয় কয়েক হাজার কোটি টাকার একটি মৌসুমি অর্থনীতি। তবে গত কয়েক বছরে এই চিত্রে বড় পরিবর্তন এনেছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। অনলাইনে পশু বিক্রির পাশাপাশি এখন দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘ভাগে কোরবানি’ সেবা, যা বিশেষ করে শহরের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে নতুন এক বিকল্প হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গরুর দাম, পশুখাদ্যের ব্যয় এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার খরচ বাড়ার কারণে এককভাবে গরু কিনে কোরবানি দেওয়া অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই অংশীদারভিত্তিক কোরবানির দিকে ঝুঁকছেন। ইসলামি বিধান অনুযায়ী একটি গরুতে সর্বোচ্চ সাতজন অংশ নিতে পারেন। আগে আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিতদের মধ্যে এ ধরনের অংশীদারত্ব তৈরি হলেও ব্যস্ত নগরজীবনে পরিচিত অংশীদার খুঁজে পাওয়া, পশু কেনা, জবাই, মাংস ভাগ-বাটোয়ারা এবং বিতরণ নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়। সেই বাস্তবতা থেকেই অনলাইনভিত্তিক ভাগে কোরবানির সেবার প্রসার ঘটছে।
এখন বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ফেসবুক পেজ এবং ডিজিটাল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আগাম অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে গরুর শেয়ার বুকিংয়ের সুযোগ দিচ্ছে। পরে তারা শরিয়াহসম্মত পদ্ধতিতে পশু কোরবানি সম্পন্ন করে নির্ধারিত সময়ে অংশগ্রহণকারীদের বাসায় মাংস পৌঁছে দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং সময়ের অভাবে বাজারে যেতে না পারা শহুরে মানুষের মধ্যে এ সেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
দেশের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি ছোট উদ্যোক্তারাও এই বাজারে যুক্ত হয়েছেন। অনলাইনভিত্তিক মাংস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি, বেঙ্গল মিট, এ বছরও ভাগে কোরবানির বিভিন্ন প্যাকেজ চালু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির হেড অব বিজনেস শেখ ইমরান আজিজ বলেন, অনলাইনে পশু বিক্রির পাশাপাশি ভাগে কোরবানির জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। ক্রেতারা এখন নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঘরে বসে বুকিং দিতে আগ্রহী হচ্ছেন। তাদের প্যাকেজের মূল্য ২৭ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে। গরুর আকার ও ওজন অনুযায়ী সর্বনিম্ন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত গরুও রয়েছে।
তিনি বলেন, কেউ চাইলে পুরো গরুও এককভাবে নিতে পারেন। তার ভাষায়, মানুষের আস্থা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে, তাই প্রতি বছর ভালো সাড়া মিলছে।
ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম সরোবরও এ বছর অনলাইন পশুর হাটের পাশাপাশি ভাগে কোরবানির সুযোগ দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির হেড অব অপারেশন মো. গোলাম সরোয়ার জানান, তিন বছর আগে তারা সীমিত পরিসরে এ কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। প্রথম বছর মাত্র ১০ থেকে ১৫টি গরু দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও দ্বিতীয় বছরে প্রায় ২৪টি গরু বুকিং হয়। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৩৬টি গরু বুকিং হয়েছে এবং এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে তাদের আশা।
তিনি বলেন, তারা তিন ধরনের শেয়ার চালু করেছেন—১০ হাজার, ১৫ হাজার ও ২২ হাজার টাকার। প্রতিটি শেয়ারের সঙ্গে অতিরিক্ত তিন হাজার টাকা সার্ভিস চার্জ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে ১৫ হাজার টাকার শেয়ার, অর্থাৎ মোট ১৮ হাজার টাকার প্যাকেজে।
গোলাম সরোয়ারের দাবি, তাদের সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে অনেক ক্রেতা আবারও ফিরে আসছেন। রিপিট গ্রাহকের সংখ্যাও বাড়ছে। অনলাইনে দীর্ঘদিন ধরে কোরবানির পশু বিক্রির সঙ্গে যুক্ত কেরানীগঞ্জের আটিবাজারের ছায়াবিথী অ্যাগ্রো ফার্মও ভাগে কোরবানির সেবা দিয়ে আসছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোজাম্মেল হক বলেন, দেশের বহু মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত কিংবা বয়স্ক মানুষ আছেন, যাদের পুরো গরু কেনার সক্ষমতা নেই অথবা কোরবানির পুরো আয়োজন সম্পন্ন করার মতো লোকবলও থাকে না। তাদের সুবিধার কথা চিন্তা করেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, কোরবানি শেষে শরিয়াহসম্মতভাবে মাংস সাত ভাগে ভাগ করে সুশৃঙ্খল প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। তাদের প্যাকেজের মূল্য ১৯ হাজার ৯০০ টাকা, ২৫ হাজার ৯০০ টাকা এবং ৩০ হাজার ৯০০ টাকা। এ মূল্যের সঙ্গে প্রসেসিং, প্যাকেজিং ও ডেলিভারি বাবদ এক হাজার টাকা যোগ হয়।
নগরবাসীর জীবনযাত্রার পরিবর্তনের প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে এই প্রবণতায়। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাসান আহমেদ বলেন, রাজধানীতে তার পরিচিত মানুষের সংখ্যা কম। ভাগে কোরবানি দেওয়ার মতো কাউকে না পাওয়ায় তিনি অনলাইনে অংশ নেওয়ার কথা ভাবছেন।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান সদ্য বিবাহিত দম্পতি হাবিব ও নীলা। মিরপুরে বসবাসকারী হাবিব বলেন, এ বছর গ্রামের বাড়ি যাওয়া হবে না। বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে একা গরু কেনা সম্ভব নয়। পরিচিত অংশীদারও নেই। তাই অনলাইনভিত্তিক ভাগে কোরবানির বিভিন্ন প্যাকেজ দেখছেন, যেখানে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে এ খাতের সব অভিজ্ঞতা ইতিবাচক নয়। বিভিন্ন বাস্তব সমস্যার কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান এই খাত থেকে সরে এসেছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজ বাংলাদেশ কয়েক বছর আগে অনলাইন পশু বিক্রি ও কোরবানি-পরবর্তী মাংস সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালনা করলেও পরে তা বন্ধ করে দেয়।
প্রতিষ্ঠানটির চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার এ এইচ এম হাসিনুল কুদ্দুস রুশো বলেন, সে সময় শুধু পশু বিক্রি নয়, জবাইয়ের পর মাংস সরবরাহের ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু ফ্রিজার ভ্যান ছাড়া মানসম্মতভাবে মাংস পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহকদের অর্থ ফেরতও দিতে হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে পশু বিক্রির জন্য সরকারিভাবে নির্ধারিত অবকাঠামোর অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাবের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন মনে করেন, অনলাইনে ভাগে কোরবানি অনেক মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান করছে। তার মতে, একদিকে বাজারে যাওয়ার ঝামেলা কমছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানি সম্পন্ন করে মাংস যথাসময়ে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে দেশ-বিদেশে থাকা মানুষও সহজে কোরবানিতে অংশ নিতে পারছেন।
তিনি বলেন, সরকার যদি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সচেতনতা ও সহায়তা বাড়ায়, তাহলে অনলাইন পশুর হাট এবং ডিজিটাল কোরবানি সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এ সেবার বিস্তার যত বাড়বে, ততই আস্থা, স্বচ্ছতা এবং ধর্মীয় বিধান যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ কোরবানি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ডিজিটাল এই নতুন ব্যবস্থার সাফল্যও শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সেই আস্থার ওপরই।
খবরটি শেয়ার করুন