ছবি: সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জলবায়ু সংকট, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, বন্যা ও পরিবেশদূষণ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করে এই প্রজন্ম। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের একটি সাধারণ অভ্যাসে সেই পরিবেশ-সচেতনতার সঙ্গে তৈরি হচ্ছে বিস্ময়কর বৈপরীত্য। গোসলের সময়ের হিসাবে সবচেয়ে বেশি পানি ব্যবহার করছেন ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী জেন জেড বা জেনারেশন জেডের সদস্যরা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনসচেতনতামূলক প্রচারণা সংস্থা ‘লেটস সেভ ওয়াটার’-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ৫২ শতাংশ অন্তত ১০ মিনিট ধরে গোসল করেন। বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে গোসল করার প্রবণতা এই বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি।
বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত গোসলের সময় কতটা দীর্ঘ, তার হিসাব নয়। পানির ব্যবহার কমানো এখন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত পানি শুধু কল খুলে পাওয়া যায় না। পানি সংগ্রহ, পরিশোধন, পাম্পের মাধ্যমে সরবরাহ এবং অনেক ক্ষেত্রে তা গরম করার সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার জড়িত। ফলে পানি অপচয় পরোক্ষভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বাড়ানোর সঙ্গেও যুক্ত।
যুক্তরাজ্যের সরকারি পরিবেশ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, সাধারণ শাওয়ারে প্রতি মিনিটে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লিটার পানি ব্যবহৃত হতে পারে। অর্থাৎ ১০ মিনিটের গোসলে ব্যবহৃত পানির পরিমাণ সর্বোচ্চ ১৫০ লিটার পর্যন্ত হতে পারে। যুক্তরাজ্যে একজন মানুষ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪০ লিটার পানি ব্যবহার করেন—অর্থাৎ দীর্ঘ সময়ের একটি গোসলই কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন মানুষের পুরো দিনের গড় পানিব্যবহারের সমান বা তার কাছাকাছি হতে পারে।
ভোক্তা পরিষদ ফর ওয়াটারের তথ্যেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায়। তাদের হিসাবে, শক্তিশালী বা মিশ্র ধরনের শাওয়ারে প্রতি মিনিটে প্রায় ১৫ লিটার পানি ব্যবহৃত হয়। সে হিসাবে ১০ মিনিটের গোসলে ১৫০ লিটার পানি চলে যেতে পারে। বিপরীতে বিদ্যুৎচালিত শাওয়ারে প্রতি মিনিটে প্রায় ৬ লিটার পানি ব্যবহৃত হয়। ফলে শাওয়ারের ধরনও মোট পানিব্যবহারের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
এখানেই জেন জেডকে ঘিরে গবেষণার বৈপরীত্যটি গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগের দিক থেকে এই প্রজন্ম অন্যদের তুলনায় এগিয়ে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবস্ক্যানের ২০২৫ সালের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেন জেডের ৭৩ শতাংশ মানুষ মানব কর্মকাণ্ড ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ক্ষতি নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। প্রায় ৪৯ শতাংশ মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তাদের ওপর সরাসরি পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণাতেও তরুণদের জলবায়ু উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী জেন জেডদের প্রায় ৬৯ শতাংশ বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বিষয়ক কোনো তথ্য দেখার পর তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন বোধ করেন। একই অনুভূতি প্রকাশ করেছেন ৫৯ শতাংশ মিলেনিয়াল, ৪৬ শতাংশ জেন এক্স এবং ৪১ শতাংশ বয়স্ক মানুষ।
অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ যত বেশি, সেই উদ্বেগ সব সময় দৈনন্দিন আচরণে একই মাত্রায় প্রতিফলিত হচ্ছে না। গোসলের সময়ের তথ্যটি সেই ব্যবধানের একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ।
‘লেটস সেভ ওয়াটার’-এর জরিপে দেখা গেছে, ৩০ থেকে ৪৫ বছর বয়সী মিলেনিয়ালদের প্রায় ৩৯ শতাংশ ১০ মিনিটের বেশি সময় ধরে গোসল করে। ৪৬ থেকে ৬১ বছর বয়সী জেন এক্সের ক্ষেত্রে এই হার ২৮ শতাংশ। আর ৬২ থেকে ৮০ বছর বয়সী বেবি বুমারদের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ বলেছে, তাদের গোসল করতে ১০ মিনিট বা তার বেশি সময় লাগে। অর্থাৎ বয়স বাড়ার সঙ্গে দীর্ঘ সময় গোসল করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।
এখানে অবশ্য একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। বেশি সময় গোসল করলেই প্রত্যেক ব্যক্তি বেশি পানি অপচয় করছেন—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। শাওয়ারের পানির প্রবাহ, যন্ত্রের ধরন, পানির চাপ এবং গোসলের সময় পানির প্রবাহ বন্ধ রাখা হয় কি না—এসব বিষয়ের ওপর মোট ব্যবহারের পরিমাণ নির্ভর করে। যেমন, যুক্তরাজ্যের অ্যাংলিয়ান ওয়াটারের তথ্য অনুযায়ী, শক্তিশালী শাওয়ারে প্রতি মিনিটে অন্তত ১৪ লিটার পানি ব্যবহার হতে পারে; ১০ মিনিটের বেশি সময় ধরে এমন শাওয়ার ব্যবহার করলে একটি পূর্ণ বাথটাবের দুই গুণেরও বেশি পানি ব্যবহৃত হতে পারে।
জেন জেডের দীর্ঘ সময় গোসলের পেছনে জীবনযাপনের পরিবর্তনও ভূমিকা রাখতে পারে। যুক্তরাজ্যে ২০২৬ সালের আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, তরুণদের একটি অংশ বাথরুমকে শুধু গোসলের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করে না। দুই হাজার ব্রিটিশ নাগরিকের ওপর পরিচালিত ওই জরিপে ৬৬ শতাংশ জেন জেড বলেছে, তারা বাথরুমে গান শোনেন। ৬২ শতাংশ সেখানে মুঠোফোনে খবর বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখে এবং ৫২ শতাংশ সেখানে টেলিভিশন বা চলচ্চিত্র দেখেছে। অর্থাৎ তরুণদের কাছে বাথরুম কখনো কখনো ব্যক্তিগত বিশ্রাম ও বিনোদনের জায়গাতেও পরিণত হচ্ছে।
এ ধরনের জীবনযাপন দীর্ঘ গোসলের প্রবণতা ব্যাখ্যা করার একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। তবে কোনো একটি জরিপ থেকে দীর্ঘ গোসলের সরাসরি কারণ নির্ধারণ করা যায় না। বরং তথ্যগুলো ইঙ্গিত দেয়, পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ থাকা এবং প্রতিটি দৈনন্দিন আচরণে পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে এখনও ব্যবধান রয়েছে।
এই ব্যবধান শুধু যুক্তরাজ্যের তরুণদের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাংলাদেশসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের জেন জেডদের নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৫৫৭ জন ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণের ওপর জরিপ চালানো হয়। গবেষণাটি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ, তা মোকাবিলার মানসিক কৌশল এবং পরিবেশবান্ধব আচরণের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং পরিবেশবান্ধব আচরণের মধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় সম্পর্ক রয়েছে। বন্যার মতো দুর্যোগ প্রত্যক্ষ করা তরুণদের মধ্যে জলবায়ু-সংক্রান্ত মানসিক প্রভাবও তুলনামূলক বেশি ছিল।
এর অর্থ হলো, জলবায়ু নিয়ে উদ্বেগকে শুধু মানসিক চাপ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এই উদ্বেগকে বাস্তব আচরণে রূপান্তর করা গেলে তা পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত পর্যায়ের পদক্ষেপ ছোট মনে হলেও বিপুল জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত আচরণে তার প্রভাব বড় হতে পারে।
এ কারণে পানির ব্যবহার কমানোর ক্ষেত্রে শুধু মানুষকে ‘কম পানি ব্যবহার করুন’ বলাই যথেষ্ট নয়। কোন আচরণে কত পানি খরচ হচ্ছে, মানুষকে সেটি বোঝানোও জরুরি। ভোক্তা পরিষদ ফর ওয়াটার দুই মিনিট কম সময় গোসল করার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে কম পানিপ্রবাহের শাওয়ার ব্যবহার করলে পানি ও জ্বালানি—দুই ধরনের সাশ্রয় সম্ভব বলে জানিয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতেও বিষয়টি ব্যক্তিগত অভ্যাস পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। দাঁত ব্রাশ করার সময় কল বন্ধ রাখা, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় শাওয়ার না চালানো, কাপড় ধোয়ার যন্ত্র পূর্ণ হওয়ার পর চালানো কিংবা পাইপের বদলে পানি দেওয়ার পাত্র ব্যবহার করার মতো ছোট পরিবর্তন সম্মিলিতভাবে বড় সাশ্রয় তৈরি করতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পানি সাশ্রয় মানেই শুধু পানির অপচয় কমানো নয়। পানি শোধন ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত শক্তির ব্যবহারও কমে। ফলে একটি ছোট গোসলের সময় কমিয়ে দেওয়া একই সঙ্গে পানি ও জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ হতে পারে।
জেন জেডের ক্ষেত্রে তাই বিষয়টি কিছুটা আত্মবিরোধী হলেও পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। এই প্রজন্ম জলবায়ু সংকট সম্পর্কে অন্যদের তুলনায় বেশি সচেতন এবং উদ্বিগ্ন—বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় যার প্রমাণ রয়েছে। এখন সেই সচেতনতাকে দৈনন্দিন জীবনের আচরণে আরও কার্যকরভাবে নিয়ে আসাই বড় চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘ গোসলের তথ্যটি সেই চ্যালেঞ্জটিই সামনে এনেছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা, পরিবেশবান্ধব পণ্য কেনা কিংবা দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পাশাপাশি নিজের বাসায় প্রতিদিন কত লিটার পানি ব্যবহার হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু বড় নীতি, আন্তর্জাতিক সম্মেলন কিংবা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। প্রতিদিনের গোসলের কয়েক মিনিটও সেই বড় লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত।
খবরটি শেয়ার করুন