ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে রেফারির একটি সিদ্ধান্ত নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে—এমন ঘটনা ফুটবলে নতুন নয়। কিন্তু আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনালে সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা শুধু ম্যাচের ফল নয়, পুরো টুর্নামেন্টের রেফারিং নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড মুখোমুখি হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।
বিশেষ করে ইংল্যান্ডের অনেক সমর্থক অভিযোগ তুলছেন, আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্টজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সুবিধা পাচ্ছে। অন্যদিকে রেফারিং বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছে, বিতর্ক থাকলেও এই সিদ্ধান্ত বিদ্যমান নিয়মের মধ্যেই নেওয়া হয়েছে।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের ৭২ মিনিটে পর্তুগালের রেফারি জোয়াও পিনেইরো প্রথমে আর্জেন্টিনার লেয়ান্দ্রো পারেদেসকে ফাউলের জন্য হলুদ কার্ড দেখান। পরে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর-এর সহায়তায় তিনি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেন। রিপ্লেতে দেখা যায়, পারেদেসের সঙ্গে সংঘর্ষে এমবোলো ফাউলের অভিনয় করেছিলেন।
ফলে পারেদেসের হলুদ কার্ড বাতিল করা হয় এবং এমবোলোকে সিমুলেশনের দায়ে হলুদ কার্ড দেখানো হয়। সেটিই ছিল তার দ্বিতীয় হলুদ কার্ড। ফলে তাকে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। অতিরিক্ত সময়ে ১০ জনের সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম গ্লোবো জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপে কার্যকর হওয়া নতুন ব্যাখ্যার আওতায় এসেছে। আগে ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দেখানো হলে ভিএআর সেটি সংশোধনের সুযোগ পেত। এবার সেই নীতির পরিধি বাড়িয়ে এমন পরিস্থিতিতেও ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারে, যেখানে রেফারি ভুলভাবে প্রতিপক্ষকে শাস্তি দিয়েছেন এবং প্রকৃত অপরাধী অন্য খেলোয়াড়। সেই ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই পারেদেসের কার্ড বাতিল করে এমবোলোকে হলুদ কার্ড দেখানো হয়।
তবে নিয়মের মধ্যে সিদ্ধান্ত হলেও সেটি নিয়ে বিতর্ক কমেনি। সুইজারল্যান্ডের প্রধান কোচ মুরাত ইয়াকিন ম্যাচ শেষে এই নিয়মকে "অগ্রহণযোগ্য" বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, এমন একটি সিদ্ধান্ত ম্যাচের ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ইয়াকিন বলেন, এমবোলোর ওপর তিনি দোষ চাপাতে চান না, কারণ খেলোয়াড়টি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সও জানিয়েছে, সুইস শিবিরের মতে, সমতায় ফেরার পর দলটি ম্যাচে ভালো অবস্থানে ছিল, কিন্তু লাল কার্ডের পর পুরো চিত্র বদলে যায়।
ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, ঘটনাটি ভিএআর যুগের সবচেয়ে জটিল সিদ্ধান্তগুলোর একটি। কারণ এখানে প্রযুক্তি কোনো অফসাইড বা গোললাইন নির্ধারণ করেনি; বরং একটি হলুদ কার্ডের মালিকানা পরিবর্তন করেছে। ফলে দর্শকদের বড় একটি অংশ প্রথমে বুঝতেই পারেনি কী ঘটেছে। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত নতুন নিয়ম সম্পর্কে ফুটবলপ্রেমীদের অজ্ঞতার বিষয়টিও সামনে এনে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস বিশ্লেষণে বলেছে, এমবোলোর লাল কার্ড আসলে "ভুল পরিচয়" নিয়মের সরাসরি উদাহরণ নয়; বরং রেফারি প্রথমে ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়ায় ভিএআর হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হয়। নিয়ম অনুযায়ী, পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখানো হয়েছিল বলেই ভিএআর বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সুযোগ পেয়েছে। এরপর রেফারি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। অর্থাৎ এটি প্রযুক্তিগতভাবে নিয়মসম্মত সিদ্ধান্ত।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কের চরিত্র ছিল ভিন্ন। অনেক ইংলিশ সমর্থক দাবি করেন, টুর্নামেন্টজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে আর্জেন্টিনা সুবিধা পাচ্ছে। কেউ কেউ মিসরের বিপক্ষে পাওয়া পেনাল্টি কিংবা অন্য ম্যাচের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর কথাও সামনে আনেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সব প্রতিক্রিয়াই আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ছিল না। জনপ্রিয় অনলাইন আলোচনায় অনেক নিরপেক্ষ সমর্থক লিখেছেন, এমবোলোর সিমুলেশন ছিল স্পষ্ট এবং তিনি আগে থেকেই হলুদ কার্ডে ছিলেন। তাঁদের মতে, নিয়ম যদি প্রয়োগ করা হয়, তাহলে এই সিদ্ধান্তকে অন্যায্য বলা কঠিন। অনেকে এটিকে ভিএআর-এর কার্যকর ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
রেফারিং বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণেও একই ধরনের বিভাজন দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল আইন বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নিয়মের উদ্দেশ্যই হলো ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়া ঠেকানো এবং সঠিক খেলোয়াড়কে দায়ী করা। তবে তারা একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, এত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নতুন নিয়মের প্রয়োগ নিয়ে আরও পরিষ্কার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। অন্যথায় দর্শক, খেলোয়াড় এমনকি ধারাভাষ্যকারদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হবে।
এমন বিতর্কের সবচেয়ে বড় প্রভাব এখন পড়তে পারে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে। ফুটবল ইতিহাসে এই দুই দলের লড়াই এমনিতেই আবেগ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক স্মৃতির কারণে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। তার ওপর যদি রেফারিং নিয়ে আগে থেকেই সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে ম্যাচ চলাকালীন প্রতিটি সিদ্ধান্তই আরও বেশি আলোচনার জন্ম দেবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া রেফারির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ভিএআর চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট ভুল সংশোধন করা। কিন্তু প্রতিবার নতুন প্রযুক্তি বা নতুন ব্যাখ্যা যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিতর্কের ধরনও বদলাচ্ছে। আগে প্রশ্ন উঠত রেফারি ভুল দেখেছেন কি না, এখন প্রশ্ন উঠছে—প্রযুক্তি কতটা ব্যবহার করা উচিত, কোন পরিস্থিতিতে করা উচিত এবং নিয়মের ব্যাখ্যা কতটা স্বচ্ছ।
বিশ্বকাপের শেষ চারের লড়াই শুরুর আগে তাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু লিওনেল মেসি বা জুড বেলিংহ্যাম নন, রয়েছেন রেফারিরাও। আর্জেন্টিনা সত্যিই সুবিধা পাচ্ছে কি না, নাকি নতুন নিয়মের প্রয়োগই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর হয়তো মিলবে না। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তি যেমন ভুল কমিয়েছে, তেমনি নতুন ধরনের বিতর্কও তৈরি করেছে। আর সেই বিতর্কই এখন বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেমিফাইনালের আগের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।
খবরটি শেয়ার করুন