ছবি: সংগৃহীত
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ও প্রবীণ সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) হেফাজতে নেওয়ার পেছনে ডিবিসি নিউজের কার্যালয়ে সৃষ্ট উত্তপ্ত পরিস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান পদ নিয়ে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। সুখবর ডটকমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, আজ বুধবার, ৪ নভেম্বর দুপুরে মহাখালীতে ডিবিসি নিউজের কার্যালয়ে যাওয়ার পর ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে কেন্দ্র করে সেখানে একপর্যায়ে মবের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে ডিবি সদস্যরা তাকে নিয়ে যান।
এর প্রায় ২০ মিনিট পর ডিবি সদস্যরা প্রতিষ্ঠানের সপ্তম তলায় বার্তাকক্ষে গিয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রাজীব ঘোষকেও সঙ্গে যেতে বলেন। এ সময় কার্যালয়ে কয়েকজন কর্মীর শোরগোল ও স্লোগান দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালীতে ডিবিসি নিউজের কার্যালয়ের সামনে থেকে ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তাকে মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রাত ১০টা পর্যন্ত তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আটক বা গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। অর্থাৎ, ডিবি হেফাজতে থাকলেও এ সময় পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবিসি নিউজের এক সংবাদকর্মী জানান, ইকবাল সোবহান চৌধুরী ডিবিসির চেয়ারম্যান বোর্ডের সদস্য। ওই বোর্ডে বিএনপিপন্থী আরও একজন রয়েছেন। তার সঙ্গে বিরোধের জেরে আজ ডিবিসি কার্যালয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে ডিবি ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে আটক করে নিয়ে যায়।
জানা গেছে, ইকবাল সোবহান চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে ডিবিসির মহাখালী কার্যালয়ে নিয়মিত যেতেন না। বুধবার সেখানে গিয়ে তিনি নিজের কক্ষে বিশেষ প্রতিনিধি রাজীব ঘোষ ও বার্তা সম্পাদক মজুমদার জুয়েলের সঙ্গে গল্প করছিলেন। এর মধ্যে কার্যালয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডিবিসির প্রযোজক মাহিন, ক্যামেরাপারসন পারভেজ ও আজাদ এ পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। তারা পাশের সরকারি তিতুমীর কলেজ ও বনানী এলাকা থেকে বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থক কয়েকজনকে কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে আধিপত্য বিস্তার এবং চেয়ারম্যান পদ নিয়ে বিরোধের জেরে এ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ডিবি সদস্যরা কার্যালয়ের নিচ থেকে নিয়ে যাওয়ার প্রায় ২০ মিনিট পর বার্তাকক্ষের সপ্তম তলায় যান তারা। সেখানে রাজীব ঘোষকে তাদের সঙ্গে যেতে বলা হয়। এ সময় ডিবিসির প্রযোজক মাহিন, ক্যামেরাপারসন পারভেজ ও আজাদ ‘সরকারের নির্দেশনা আছে’, ‘ফ্যাসিস্ট হটাও’—এ ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন। রাজীব ঘোষকে ডিবি সদস্যরা নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে ‘র-এর এজেন্ট’ বলেও স্লোগান দেওয়া হয়। এরপর পারভেজ ও আজাদ দুজন বার্তা সম্পাদককে সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে চিৎকার করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রের ভাষ্য।
ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম সুখবর ডটকমকে হেফাজতে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ইকবাল সোবহান চৌধুরী ডিবিসি কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি মবের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। পরে তাকে সেখান থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের পর বিস্তারিত জানানো হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মো. আকতার হোসেন এ বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান, একটি সংবাদ প্রচারকে কেন্দ্র করে ডিবিসি কার্যালয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। খবর পেয়ে ডিবি সদস্যরা সেখানে যান। পরে ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও রাজীব ঘোষকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। তাদের নিরাপদে হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি।
ডিবিসি নিউজের একাধিক কর্মীও ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির অ্যাসাইনমেন্ট সম্পাদক ও ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সভাপতি মুক্তাদির অনিক জানান, বুধবার কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ডিবি সদস্যরা নিয়ে যান। তবে কী কারণে তাকে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া কোনো মামলার সূত্রে তাকে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হলেও এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মুক্তাদির অনিক জানান, ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বর্তমানে ডিবিসি নিউজে কোনো পদ নেই। তিনি অতীতে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক অবজারভার পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
ডিবিসি নিউজের ক্রাইম চিফ ও জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রাজীব ঘোষকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা। তবে তাকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। মুক্তাদির অনিক জানান, রাজীব ঘোষ দীর্ঘদিন ধরে অপরাধবিষয়ক সংবাদ নিয়ে কাজ করছেন। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে তার পরিচিতি ও যোগাযোগ রয়েছে। সেই সূত্রে ডিবি সদস্যরা তার সঙ্গে কিছু বিষয়ে কথা বলতে চান বলে জানিয়েছেন। তাকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে কথা বলার জন্য সঙ্গে যেতে বলা হয়েছে বলেই তারা বুঝতে পেরেছেন।
এদিকে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার বিষয়ে ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া পর্যালোচনাসংক্রান্ত আন্তমন্ত্রণালয় সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘ইকবাল সোবহান চৌধুরী যদি আটক হয়ে থাকেন, আমি জানি না হয়েছেন কি না। যদি হয়ে থাকেন, তার বিরুদ্ধে নির্ধারিত কোনো অভিযোগ আছে কি না, সেটা দেখা যাবে।’
এর আগে গত ১৫ এপ্রিল পবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাওয়ার সময় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে। সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে তার জেদ্দা যাওয়ার কথা ছিল। তবে কী কারণে তাকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই-আগস্টেের আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে অনেকটা আড়ালে ছিলেন ইকবাল সোবহান চৌধুরী। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীর জানাজায় অংশ নিতে তাকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে দেখা যায়।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) নেতৃত্ব দিয়েছেন ইকবাল সোবহান চৌধুরী। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির নেতাদের মালিকানাধীন টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সংবাদপত্রের মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিরোধ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটিতে দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। ডিবিসি নিউজও এর বাইরে নয়। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান পদ এবং পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে ইকবাল সোবহান চৌধুরীর প্রতিষ্ঠানটিতে অবস্থান ও তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তার প্রতিষ্ঠানটিও পুরোপুরি দখলের চেষ্টা চলছে।
ডিবিসি নিউজের সম্প্রচারিত সংবাদে অবশ্য এ ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বুধবার রাতে প্রতিষ্ঠানটির সংবাদে বলা হয়, পোশাক খাতের বিদ্যমান বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি গণমাধ্যমেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। এর অংশ হিসেবে ইকবাল সোবহান চৌধুরী বুধবার ডিবিসি কার্যালয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান পদ দখলের চেষ্টা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্যোগ নেন বলে সংবাদে দাবি করা হয়।
এ ঘটনায় সাংবাদিক নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও রাজীব ঘোষকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে সংগঠনটির সভাপতি সাজ্জাদ আলম খান তপু ও সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেন তাদের সম্মানের সঙ্গে কর্মস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রবীণ সাংবাদিক নেতা, দৈনিক অবজারভার-এর সম্পাদক এবং ডিবিসির সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রাজীব ঘোষের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি। সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় থেকে তাদের ডিবি হেফাজতে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
সাংবাদিক নেতাদের মতে, সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে সৃষ্ট বিরোধ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সমাধান হওয়া উচিত স্বচ্ছ ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায়। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া সাংবাদিকদের দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের নামে হেফাজতে রাখা হলে তা পেশাগত স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্ন তৈরি করে। বুধবার রাত ১০টা পর্যন্ত ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার না দেখানো এবং তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রকাশ না করা এ ঘটনাকে ঘিরে প্রশ্ন আরও বাড়িয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন