বুধবার, ৪ঠা নভেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯শে কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ইসরায়েলকে ৩৮০ কোটি ডলারের নিরাপত্তা সহায়তা বন্ধের ঘোষণা ট্রাম্পের *** বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিক আন্দোলন ও প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে যা বললেন জয়সওয়াল *** আওয়ামী লীগের সাবেক এমপির কাছে কোটি টাকা ঘুষ চাওয়া প্রসিকিউটর দেশ ছেড়েছেন *** বড়দিনে ২ কোটি টাকা অনুদান চেয়েছিল কল্যাণ ট্রাস্ট, প্রধানমন্ত্রী দিলেন ৩ কোটি *** এবার আফগানিস্তানের লিগেও সাকিব, খেলবেন কোন দলে *** যার সঙ্গে সংঘর্ষে ফুটবলারের মৃত্যু, কেমন আছেন সেই গোলরক্ষক? *** গণভোটের রায় উপেক্ষার অভিযোগ করে সংবিধান সংশোধন কমিটির সভা বর্জন কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের *** ‘আদালতের মধ্যে সাংবাদিক কেন’ *** ‘ভারতীয় নাগরিক’, ‘র’-এর এজেন্ট’ অপপ্রচারই কী শম্পা গোস্বামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার ভিত্তি *** কুইক রেন্টালের নামে লুটপাটের পরিবর্তে সাশ্রয়ী উপায়ে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

অভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ-জামায়াতের গোপন ‘সমঝোতা’

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৭:৩২ অপরাহ্ন, ২রা নভেম্বর ২০২৬

#

ফাইল ছবি

রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের আদর্শিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী গোপনে সমঝোতার পথে এগোচ্ছে বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের অন্তত সাত নেতা সুখবর ডটকমকে জানিয়েছেন, অভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সামনে রেখে আপাতত জামায়াতের সঙ্গে গোপন সমঝোতা করছে আওয়ামী লীগ। তাদের দাবি, এই সমঝোতার পেছনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অন্তত দুটি দেশের ভূমিকা রয়েছে। দেশ দুটি চায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে আবার শক্তিশালী হয়ে রাজনীতিতে ফিরুক।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতের মধ্যে গোপন ঐক্যের অভিযোগ তুলেছেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দল দুটির মধ্যে নতুন যোগসাজশের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে এক জনসভায় দাবি করেন তিনি। তার বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, দল দুটির সম্ভাব্য সমঝোতার প্রধান ভিত্তি আদর্শ নয়, বরং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত অভিন্ন স্বার্থ। সূত্রগুলোর ভাষ্য, জামায়াত মনে করছে, বিএনপি সরকার ব্যর্থতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাকে দলটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগও দেশে সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে জামায়াতের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানকে বিবেচনায় নিচ্ছে।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সাবেক ১৪ দলীয় জোট ও মহাজোটের বাইরে বর্তমানে দেশে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের অবস্থান দলটির হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে দলটির নেতারা মনে করছেন। জাতীয় সংসদে জামায়াতের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন রয়েছে। ফলে সংসদীয় রাজনীতিতে দলটির প্রভাব ও রাজনৈতিক অবস্থানকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের নেতাদের মতে, এই বাস্তবতা সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার দাবি, দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে সম্ভাব্য দেশে ফেরার আগে জামায়াতের সঙ্গে গোপন সমঝোতার বিষয়টি আরও এগিয়েছে। তাদের বক্তব্য, দেশে এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ ক্ষমতাসীন বিএনপি। তবে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিবেচনায় জামায়াতও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াতকে পাশে রাখলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের প্রচেষ্টা সুবিধাজনক হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

সূত্রগুলোর দাবি, জামায়াতের বাইরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সাবেক ১৪ দলীয় জোট ও মহাজোটের অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকেও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হচ্ছে। সরকারের ধারণা, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর আওয়ামী লীগ বর্তমানে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। চলমান পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে আওয়ামী লীগের উস্কানি রয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য কিংবা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসও আওয়ামী লীগের নেতাদের দেশে ফেরার বিষয়টি সামনে এনেছেন। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগের নেতারা বিদেশ থেকে দেশে ফেরা শুরু করেছেন। সরকারের এই বক্তব্য এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ দেশে ফিরে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

জামায়াত বর্তমানে বিএনপি সরকারের সমালোচক অবস্থানে রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে দলটির রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সমালোচনা সংসদ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের মতে, বিএনপি সরকারের সঙ্গে জামায়াতের এই দূরত্ব রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে সরকারের সমালোচনা করলেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয় না বলে অনেকের ধারণা।

আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে সম্ভাব্য এই সমঝোতার গুরুত্ব বুঝতে হলে দুই দলের সম্পর্কের ইতিহাস বিবেচনা করা প্রয়োজন। দেশের রাজনীতিতে দল দুটি দীর্ঘদিন ধরে বিপরীত আদর্শিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে দুই দলের অবস্থান পরস্পরবিরোধী।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জামায়াত আবার রাজনীতিতে ফিরে আসে। দুই দলের মধ্যে বিরোধ ও অবিশ্বাস দীর্ঘস্থায়ী হলেও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাদের একই আন্দোলনে অংশ নিতে বাধ্য করেছে।

ষাটের দশকে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের শাসনের বিরোধিতায় আওয়ামী লীগ ও জামায়াত অন্য বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সম্মিলিত বিরোধী দল এবং পরে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন উদ্যোগে অংশ নেয়। ১৯৬৪ সালে কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি এবং ১৯৬৯ সালে ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন কমিটির ব্যানারে দুই দলের অবস্থান এক হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, সামরিক শাসনের অবসান ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের পরও দুই দলের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। জামায়াতের নেতা গোলাম আযম শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ দুই দলের রাজনৈতিক পথ সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়।

আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং নব্বইয়ের দশকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আবারও আওয়ামী লীগ ও জামায়াতকে একই রাজনৈতিক অবস্থানে দেখা যায়। ১৯৯০-এর দশকে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও অন্যান্য বিরোধী দল একসঙ্গে আন্দোলন করে। ১৯৯৬ সালে এই আন্দোলনের চাপে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত হয়।

তবে এই রাজনৈতিক সহযোগিতা কখনো দুই দলের আদর্শিক বিরোধের অবসান ঘটায়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করলে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিচার হয়। কয়েক নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দুই দলের রাজনৈতিক বৈরিতা আরও তীব্র হয়।

এমন পটভূমিতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে নতুন সমঝোতার উদ্যোগের দাবি দেশের রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকের মতে, অতীতের রাজনৈতিক সহযোগিতার নজির বর্তমানের গোপন সমঝোতার প্রমাণ নয়। একইভাবে দুই দলের মধ্যে আদর্শিক বিরোধ থাকলেও রাজনৈতিক স্বার্থে যোগাযোগ বা সহযোগিতার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আওয়ামী লীগের নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য সমঝোতার পেছনে দুটি প্রভাবশালী দেশের ভূমিকা রয়েছে। তাদের দাবি, দেশ দুটি আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে চায়। তবে ওই দেশগুলোর পরিচয়, তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা জামায়াতের যোগাযোগের ধরন এবং সমঝোতার বিষয়ে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ সূত্রগুলো প্রকাশ করেনি।

সমঝোতা নিয়ে দুই দলের নেতাদের প্রকাশ্য অবস্থানও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের নেতারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য না করার নীতি অবলম্বন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে দুই দলের নেতাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে আগের মতো প্রকাশ্য সমালোচনা না করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পুনর্গঠন, জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি এবং বিএনপি সরকারের ভবিষ্যৎ অবস্থান—সব মিলিয়ে রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরির আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য সমঝোতা সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক হিসাবের অংশ। তবে দল দুটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য কিংবা প্রকাশ্য রাজনৈতিক উদ্যোগ না আসা পর্যন্ত এই সমঝোতার প্রকৃতি, পরিসর ও বাস্তবতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামী

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250