ছবি: সংগৃহীত
‘ভারতীয় নাগরিক’, ‘ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’-এর এজেন্ট, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে ‘অর্থায়ন’ এবং কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্যে জড়িত—এমন নানা অভিযোগ ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের আমল থেকে প্রচারিত হচ্ছে সাতক্ষীরার নারী অধিকারকর্মী ও প্রেরণা নারী উন্নয়ন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক শম্পা গোস্বামীর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের মধ্যে তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগকে সন্দেহজনক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এবার তার বিরুদ্ধে হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। শম্পার অভিযোগ, তাকে নিয়ে সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত অপপ্রচারই এ মামলার ভিত্তি তৈরি করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দৈনিক আমার দেশ গত ২৬ জুলাই ‘ভারতীয় নাগরিক শম্পা গোস্বামীর কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে শম্পা গোস্বামীর বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্ব, অবৈধ অর্থ লেনদেন, সম্পদ অর্জন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়। এসব অভিযোগের অধিকাংশই স্থানীয় ব্যক্তি ও সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। শম্পা গোস্বামী অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।
সুখবর ডটকমের কাছে শম্পা গোস্বামী অভিযোগ করেন, পত্রিকায় এ ধরনের প্রচারই তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়েরের ভিত্তি। তার দাবি, তাকে ভারতীয় নাগরিক ও ‘র’-এর এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তার সামাজিক ও মানবাধিকার কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।
আমার দেশের প্রতিবেদনে ২০২১ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাতক্ষীরার শ্যামনগরে যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরে পূজা দেওয়ার ঘটনাকে শম্পা গোস্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগের একটি উপাদান হিসেবে তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, মোদির সাতক্ষীরা সফর ঘিরে শম্পা ‘অতি উৎসাহী’ ছিলেন। এ ঘটনাকে তার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহের ভিত্তি হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের সফরকে ঘিরে স্থানীয় একজন নারী অধিকারকর্মীর উৎসাহ বা অংশগ্রহণের আগ্রহ তার বিদেশি নাগরিকত্ব কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ হতে পারে না। রাজনৈতিক বা সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কারও আগ্রহকে অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্দিষ্ট তথ্য, নথি ও যাচাইযোগ্য সাক্ষ্য প্রয়োজন। নাগরিকত্বের প্রশ্নও আলাদা আইনি ও দালিলিক বিষয়। এ ক্ষেত্রে ‘অতি উৎসাহী’ হওয়ার মতো বর্ণনামূলক শব্দের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব বা গোয়েন্দা পরিচয় নির্ধারণের সুযোগ নেই।
শম্পা গোস্বামী ভারতীয় নাগরিক নন। তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগের সমর্থনে আমার দেশের প্রতিবেদনে যে নথি ও তথ্যের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে ভারতীয় নাগরিকত্বের দাবি ও প্রমাণিত নাগরিকত্বের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি বলে অভিজ্ঞদের অভিমত।
শম্পা গোস্বামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাটি দায়ের হয় গত ২৯ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ১৪ আগস্ট শম্পা গোস্বামীর কার্যালয়ে আয়োজিত একটি সমাবেশে তিনি নির্বাচিত সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। মামলার বাদী শ্যামনগর থানার উপপরিদর্শক মো. রশিদুজ্জামান।
শম্পা গোস্বামী দেবহাটার তপন গোস্বামী ও অনিতা গোস্বামীর মেয়ে এবং আনন্দ চ্যাটার্জীর স্ত্রী। তিনি সাতক্ষীরার প্রেরণা নারী উন্নয়ন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নারী অধিকার, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, মানবাধিকার, পরিবেশ, জীবিকা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকেই তার মানবাধিকার কর্মকাণ্ডের কারণে বিভিন্ন ধরনের হুমকি, হয়রানি ও চাপের মুখে পড়ার ঘটনা রয়েছে।
শম্পার বিরুদ্ধে মামলার পাশাপাশি তার চলাচলেও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স জানায়, গত ২১ আগস্ট বালিতে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়ার সময় তাকে বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয়। পরে ২০ সেপ্টেম্বর তিনি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। ১৭ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি এ-সংক্রান্ত চিঠি পান। সংগঠনটি জানায়, প্রেরণা প্রয়োজনীয় আর্থিক নথি, বিল ও ভাউচার জমা দিয়েছে।
শম্পা গোস্বামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা এবং তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি)। বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, শম্পার বাসভবন ও কার্যালয়ে পুলিশি নজরদারি এবং পরিবারের সদস্যদের হয়রানির অভিযোগ তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। মানবাধিকারকর্মীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর অভিযোগ আনার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা অপরিহার্য বলে মনে করে সংগঠনটি। মামলার আইনগত ভিত্তি ও অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং শম্পার অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
এইচআরএফবি আরও বলেছে, সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতা এবং ৪৩ অনুচ্ছেদে গৃহ ও যোগাযোগের গোপনীয়তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে নজরদারি ও পরিবারের সদস্যদের হয়রানির অভিযোগ যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। সংগঠনটি শম্পা, তার পরিবার এবং প্রেরণার কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের ভয়ভীতি, হয়রানি ও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। এইচআরএফবি ২০টি মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের জোট; এর সদস্যদের মধ্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্র, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্সও শম্পা গোস্বামীর বিরুদ্ধে প্রচারিত অভিযোগ, তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং ‘র’-এর এজেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। সংগঠনটির মতে, তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্য তার চরিত্র, পরিবার ও মানবাধিকার কর্মকাণ্ডকে লক্ষ্য করে চালানো অপপ্রচারের অংশ। তার দুই মেয়েকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অশালীন ও মানহানিকর মন্তব্যের শিকার হতে হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
এদিকে শম্পা গোস্বামীর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে শুরু হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন জানিয়েছে। এ তদন্তের ফলাফল, তার নাগরিকত্ব নিয়ে কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত কিংবা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নথি ছাড়া অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
শম্পা গোস্বামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা এখন শুধু একজন নারী অধিকারকর্মীর আইনি লড়াই নয়; সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত অভিযোগ, নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন, মানবাধিকার কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর আইনি অভিযোগের সম্পর্কও সামনে এনেছে। মামলার প্রকৃত ভিত্তি নির্ধারণে প্রয়োজন এজাহারে উল্লিখিত বক্তব্যের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, অভিযোগের প্রমাণ যাচাই এবং তার বিরুদ্ধে প্রচারিত নাগরিকত্ব ও গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতার দাবির দালিলিক পরীক্ষা। অভিযোগ ও প্রমাণের এই পার্থক্য স্পষ্ট না হলে সংবাদমাধ্যমের প্রচারই কারও বিরুদ্ধে গুরুতর আইনি অভিযোগের জনমত তৈরির উপাদান হয়ে উঠতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন