ছবি: সংগৃহীত
দিল্লিতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য ভার্চ্যুয়াল বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক অঙ্গনে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ভারত। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, শেখ হাসিনা যে অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হওয়ার কথা, সেটি একটি বেসরকারি উদ্যোগ। এর সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং ওই মঞ্চে দেওয়া কোনো বক্তব্য বা মতামতকে ভারত সরকার সমর্থনও করে না।
আজ মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। তিনি বলেন, আগামীকাল বুধবার দিল্লিতে যে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হবেন, সেটি একটি বেসরকারি সংস্থার আয়োজন। এতে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট করেন, ওই ফোরামে প্রকাশিত কোনো বক্তব্য বা মতামতের দায়ও ভারত সরকারের নয়।
ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম, যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ইকোনমিক টাইমসও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, অনুষ্ঠানটি সরকারি নয় এবং এর রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক দায়ভারও কেন্দ্রীয় সরকার বহন করছে না।
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য এই বক্তব্যকে ঘিরে এর আগে ঢাকার পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। গতকাল সোমবার ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের ব্যক্তি যেন ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন কিংবা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন, সে বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ বিষয়ে ভারত যেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়, সে প্রত্যাশাও জানানো হয়।
বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্যের পরপরই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই ব্যাখ্যাকে কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা। কারণ, ভারত সরকার একদিকে অনুষ্ঠান থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে এটিকে সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগ বলেও উল্লেখ করেছে।
ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বৈঠকে বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেওয়া হবে এবং এ বিষয়ে ভারত সচেষ্ট থাকবে।
এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের যে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তা এখনো বহাল রয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান আগামী ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন। এটি ব্রিকসের নিয়মিত প্রক্রিয়ারই অংশ এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের ভিত্তিতেই এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়েও ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন করা হয়। ভারতের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জানতে চাওয়া হলে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। গঙ্গা চুক্তিসহ পানিসম্পদ-সংক্রান্ত সব বিষয় যৌথ নদী কমিশন এবং দুই দেশের বিদ্যমান কূটনৈতিক ও কারিগরি কাঠামোর মাধ্যমেই আলোচনা করে এগিয়ে নেওয়া হবে।
অন্যদিকে মঙ্গলবার সকালে ঢাকায় আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য বক্তব্য প্রচার না করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, এর আগেও সরকার গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছিল। আদালতের নির্দেশনা এখনো বহাল থাকায় সেটি অনুসরণ করা প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, কেউ যদি আগাম প্রচার করে যে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেবেন এবং পরে সেই বক্তব্য প্রকাশ বা সম্প্রচার করে, তাহলে তা আদালতের আদেশ অমান্য করার শামিল হবে। আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘিত হলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ডা. জাহেদ উর রহমান আরও বলেন, আদালতের আদেশ না থাকলে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে বাধা দেওয়া উচিত হতো না—এটি তার ব্যক্তিগত মত। তবে আদালতের আদেশের সঙ্গে কেউ একমত না হলে আইনি প্রক্রিয়ায় সেটি চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। কিন্তু আদেশ বহাল থাকা পর্যন্ত তা সবাইকে মানতে হবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শেখ হাসিনার এই ভার্চ্যুয়াল বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অবস্থান জানতে চেয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ভারত স্পষ্ট করে জানিয়েছে, দিল্লিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগ এবং সরকার এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনার এই উপস্থিতিকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা তৈরি হলেও উভয় দেশই সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বুধবারের নির্ধারিত ভার্চ্যুয়াল বক্তব্য প্রচার বা প্রকাশ না করতে দেশের গণমাধ্যমকে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ সরকার। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে তিনি অনলাইনে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। ২০২৫ সালে আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাংলাদেশের একটি আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে শেখ হাসিনা ওই রায়কে আইনগতভাবে অকার্যকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
রয়টার্স জানায়, ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর এই প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যাচ্ছেন, যদিও সেটি হবে ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে। নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া আয়োজিত অনুষ্ঠানে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং আরও কয়েকজন বক্তাও উপস্থিত থাকবেন। তবে শেখ হাসিনার সহযোগীরা তার বক্তব্যে কী থাকবে, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি।
গত মাসে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি এবং তার দলের কয়েকজন নেতা আগামী ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বর্তমান বাংলাদেশ সরকার কীভাবে তাদের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিষয়টি মোকাবিলা করে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মঙ্গলবার বাংলাদেশের তথ্য উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান দেশীয় গণমাধ্যমকে সতর্ক করে বলেন, শেখ হাসিনার নির্ধারিত বক্তব্য প্রচার বা প্রকাশ করা হলে তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের আদেশের লঙ্ঘন হবে। ওই আদেশে গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনার বক্তব্য, বিবৃতি, সাক্ষাৎকার, অডিও বা ভিডিও বার্তা প্রকাশ ও সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার সহযোগী আবু ওবায়দা আরিন জানিয়েছেন, অনুষ্ঠানটি নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে। তার ভাষায়, ভিন্নমত দমনের জন্য ঢাকার উদ্যোগ দেশের সীমানার বাইরে থাকা কণ্ঠগুলোকে স্তব্ধ করতে পারবে না।
রয়টার্স জানায়, শেখ হাসিনার এই নির্ধারিত বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে অনুরোধ জানিয়েছে। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পলাতক হিসেবে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তিকে ভারতের মাটিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হলে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চলমান প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনাকে ভারতের কাছ থেকে প্রত্যর্পণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা ভারতের মাটি থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে চলেছেন—এ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা একাধিকবার নয়াদিল্লিকে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশই পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার এই ভার্চ্যুয়াল বক্তব্য এবং তা ঘিরে কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
খবরটি শেয়ার করুন