ফাইল ছবি
আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে ভারত থেকে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ফিরলে তার সঙ্গে দেশে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যদের একটি অংশও আদালতে আত্মসমর্পণ করতে পারে। ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত ছয়জন নেতা সুখবর ডটকমকে জানিয়েছেন, দেশে আত্মগোপনে থাকা ২৫ থেকে ৩০ জন সাবেক সংসদ সদস্যের সঙ্গে শেখ হাসিনার যোগাযোগ রয়েছে।
তাদের ভাষ্য, এসব সাবেক সংসদ সদস্যের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাদের একটি অংশও তার সঙ্গে আত্মসমর্পণের বিষয়ে নেত্রীর সঙ্গে কথা বলেছে।
তবে আত্মগোপনে থাকা সব সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হাসিনার সঙ্গে একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। আওয়ামী লীগের ওই নেতাদের ভাষ্য, কারা শেখ হাসিনার সঙ্গে আদালতে যাবেন এবং কারা বাইরে থেকে দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকবেন, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনাই নেবেন। তাদের মতে, শেখ হাসিনা মনে করছেন, যেসব নেতা এখনো কারাগারের বাইরে রয়েছেন, তাদের একটি অংশকে দলীয় কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে হবে।
অর্থাৎ শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সঙ্গে আত্মগোপনে থাকা সাবেক সংসদ সদস্যদের সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপের বিষয়টিও আওয়ামী লীগের ভেতরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশে ফিরে শেখ হাসিনা নিজে আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তার সঙ্গে দলের কতজন নেতা একই পথে যাবেন, আর কতজন আত্মগোপনে থেকেই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকবেন—এখন সেটিই আলোচনার অন্যতম বিষয়।
গত জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা প্রথম দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। এরপর আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকার ও বক্তব্যে তিনি তার দেশে ফেরার পরিকল্পনা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তার বক্তব্যটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।
৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে বিদেশি সাংবাদিকদের সংগঠন ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া অডিও বক্তব্যেও শেখ হাসিনা ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার কথা বলেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও ইন্ডিয়া টুডে তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে জানায়, তিনি ডিসেম্বরেই দেশে ফিরতে চান।
সেপ্টেম্বরেও এই অবস্থান থেকে সরে আসেননি শেখ হাসিনা। হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি নিজেই ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরতে চান। আনন্দবাজারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তাকে ডিসেম্বরের ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেছে।
শেখ হাসিনার এই ঘোষণায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আস্থা রাখছেন। তারা মনে করছেন, দলীয় সভাপতি ঘোষিত সময়ের মধ্যেই দেশে ফিরবেন।
এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বড় একটি অংশ দেশের বাইরে চলে যায়। তাদের মধ্যে অনেকে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। তবে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এখনো দেশের ভেতরে আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্যও রয়েছেন। তারা বিদেশে চলে যাওয়ার সুযোগ পাননি।
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত ছয়জন নেতা সুখবর ডটকমকে জানিয়েছেন, দেশে আত্মগোপনে থাকা ২৫ থেকে ৩০ জন সাবেক সংসদ সদস্যের সঙ্গে শেখ হাসিনার যোগাযোগ রয়েছে। সাবেক এসব এমপি আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাননি। তাই দেশেই আত্মগোপনে আছেন।
তাদের ভাষ্য, এসব সাবেক সংসদ সদস্যের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাদের একটি অংশও তার সঙ্গে আত্মসমর্পণ করার বিষয়ে নেত্রীর সঙ্গে কথা বলেছে।
ওই নেতারা সুখবর ডটকমকে বলেন, আত্মগোপনে থাকা সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে সবাই শেখ হাসিনার সঙ্গে একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন—এমন সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। কারা তার সঙ্গে আত্মসমর্পণ করবেন, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনাই নেবেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা মনে করছেন, যেসব নেতা এখনো কারাগারের বাইরে রয়েছেন, তাদের একটি অংশকে দলীয় কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে হবে।
সুখবর ডটকমকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আত্মগোপনে থাকা সাবেক সংসদ সদস্যদের সঙ্গে শেখ হাসিনার যোগাযোগ নিয়মিত। দেশে ফেরার পর কারা তার সঙ্গে আদালতে যাবেন এবং কারা বাইরে থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকবেন—এ বিষয়টি নিয়েই আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে দেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার মধ্যে দলটির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আত্মগোপনে থাকা একাধিক সাবেক সংসদ সদস্যও গ্রেপ্তার হয়েছেন। গত সাত মাসের সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে অন্তত আটজন সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যের গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়।
এর মধ্যে প্রথম ঘটনা ঘটে ২৮ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ঢাকার একটি ইফতার অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহ আলম জনতার হাতে আটক হন এবং পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার দেখায়। ১ মার্চ আদালত তাকে কারাগারে পাঠান। তবে কোনো মামলা বা অভিযোগ না থাকায় ১০ মার্চ তিনি জামিনে মুক্তি পান।
এরপর ২৩ মার্চ রাতে বা ২৪ মার্চের প্রথম প্রহরে ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ডেইলি স্টার ও বাসসের প্রতিবেদনে তার গ্রেপ্তারের তারিখ ২৪ মার্চ উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।
৮ এপ্রিল রাতে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে লালমনিরহাট-কুড়িগ্রাম সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সফুরা বেগম রুমিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৭ জুন রাতে ঢাকার গুলশান এলাকা থেকে জামালপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
৫ আগস্ট রাতে ঢাকার গুলশান এলাকা থেকে গাজীপুর-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার লালমাটিয়া এলাকা থেকে পাবনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার আজিজুল হক অরজুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২২ সেপ্টেম্বর ভোরে ঢাকার গুলশান-২ এলাকা থেকে চট্টগ্রাম-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে ঢাকার মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোড এলাকা থেকে নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তাক আহমেদ রুহিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সাম্প্রতিক সময়ে শুধু সাবেক সংসদ সদস্য নয়, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও অভিযান চলছে। ১১ সেপ্টেম্বর গুলশানে আওয়ামী লীগের একটি ঝটিকা মিছিলের পর ঢাকায় ৩২ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে দ্য ডেইলি স্টার। এর আগে ও পরে যশোর ও মুন্সিগঞ্জেও আওয়ামী লীগের কয়েক ডজন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এর মধ্যেই আওয়ামী লীগের ভেতরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভারতে অবস্থানরত দলটির শীর্ষ নেতাদের ভাষ্য, দেশে থাকা আত্মগোপনকারী সাবেক সংসদ সদস্যরা শেখ হাসিনার দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে কারা তার সঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন এবং কারা বাইরে থেকে দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকবেন, সেই সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে তারা মনে করছেন।
তবে আত্মগোপনে থাকা সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে কারা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি। আওয়ামী লীগের ভারতে অবস্থানরত নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সময় ও তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার যে পরিকল্পনার কথা একাধিকবার জানিয়েছেন, তার সঙ্গে আত্মগোপনে থাকা সাবেক সংসদ সদস্যদের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের যোগসূত্র নিয়েই এখন আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনা চলছে। তবে শেষ পর্যন্ত কতজন তার সঙ্গে আদালতে যাবেন, আর কতজন বাইরে থেকে দলীয় কার্যক্রমে যুক্ত থাকবেন, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সিদ্ধান্ত এবং দেশে ফেরার পর উদ্ভূত পরিস্থিতির ওপর।
খবরটি শেয়ার করুন