শনিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** জার্মানিতে ‘নব্য-নাৎসিদের উত্থান’ দেখে আতঙ্কিত ইউরোপ, বদলে যাচ্ছে কি রাজনীতির সমীকরণ *** প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর কেন সংক্ষিপ্ত হচ্ছে *** প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বাড়িতে উঠলেন ফুটপাতে বাস করা গোলাপি বেগম *** রাজধানীতে ৪ এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের পর এবার বাসে আগুন *** দুই দেশের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পলাতক নানকের বিলাসী জীবন *** দিল্লিতে আওয়ামী লীগের বৈঠক রাত ৯টায়: দ্য ওয়াল *** তেজগাঁওয়ে মসজিদে গোপন বৈঠক, জঙ্গি সন্দেহে আটক ২৩ *** দিল্লিতে আওয়ামী লীগের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিলের গুজব, নেপথ্যে কাদের–নানকপন্থীরা? *** দ্য উইকের দাবি: দিল্লিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের বৈঠক বাতিল হলো কেন *** শেখ হাসিনা আমলের ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে ঢাকা, কী বলছে নয়াদিল্লি

সুখবর এক্সপ্লেইনার

কর-জিডিপি অনুপাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদান-ইয়েমেনের সামান্য ওপরে বাংলাদেশ

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ১১:২৫ অপরাহ্ন, ১০ই জুন ২০২৬

#

ছবি: ডেইলি স্টার

অর্থনীতির আকার যত বড়ই হোক, রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা নির্ভর করে সেই অর্থনীতি থেকে কতটা রাজস্ব সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে তার ওপর। কারণ রাজস্বই একটি সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, অবকাঠামো নির্মাণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার প্রধান ভিত্তি। কিন্তু সেই জায়গাতেই বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি।

ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে কর-জিডিপি অনুপাতের বিচারে দেশের অবস্থান বিশ্বের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদান ও ইয়েমেনের তুলনায়ও বাংলাদেশ মাত্র সামান্য এগিয়ে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে সরকার রাজস্ব হিসেবে সংগ্রহ করতে পেরেছে মাত্র ৮ টাকা ৩৪ পয়সা।

আন্তর্জাতিকভাবে সাধারণভাবে ১৫ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাতকে একটি ন্যূনতম কার্যকর মান হিসেবে ধরা হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশ শুধু লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচেই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া এবং সমমানের বহু উন্নয়নশীল দেশের তুলনায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।

ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী ভারতে কর-জিডিপি অনুপাত ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশ, পাকিস্তানে ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ১৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ভুটানে এই হার প্রায় ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং সুদানে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ খুব বেশি এগিয়ে নয়—এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক একটি চিত্র।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ার কারণ কেবল করের হার কম হওয়া নয়; বরং সমস্যাটি অনেক গভীরে প্রোথিত। দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক খাতে পরিচালিত হয়, যা কর প্রশাসনের আওতার বাইরে রয়ে গেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, দেশে আয়কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) গ্রহণকারীর সংখ্যা কয়েক কোটিতে পৌঁছালেও নিয়মিত কর রিটার্ন জমা দেন তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক মানুষ। ফলে সম্ভাব্য করদাতাদের একটি বড় অংশ কার্যত কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দেশের মূল সমস্যা করের হার নয়, বরং করের আওতা অত্যন্ত সীমিত। গ্রামীণ অর্থনীতি, উপশহরের শিল্প এলাকা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং বিভিন্ন সেবা খাতের বড় অংশ এখনও কার্যকরভাবে করের আওতায় আসেনি। এর ফলে অর্থনীতির সম্প্রসারণ ঘটলেও রাজস্ব আহরণ সেই অনুপাতে বাড়ছে না।

কর কাঠামোর আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো প্রত্যক্ষ করের পরিবর্তে পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। ভ্যাট, আমদানি শুল্ক ও বিভিন্ন পরোক্ষ কর থেকে রাজস্বের বড় অংশ আসে। অথচ উন্নত অর্থনীতিগুলোতে আয়কর ও সম্পদভিত্তিক করের মতো প্রত্যক্ষ করের ভূমিকা বেশি। প্রত্যক্ষ করের আওতা সীমিত হওয়ায় উচ্চ আয়ের অনেক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আয় কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তারা ভ্যাটের মাধ্যমে তুলনামূলক বেশি করের বোঝা বহন করছেন।

কর আদায়ের দুর্বলতার সঙ্গে দুর্নীতি ও সুশাসনের প্রশ্নটিও গভীরভাবে সম্পর্কিত। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টারের (আইজিসি) বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে সরকারি ব্যয়ে দুর্নীতির কারণে করদাতাদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। মানুষ যখন মনে করে তাদের দেওয়া করের অর্থ অপচয় হচ্ছে বা দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট হচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই কর প্রদানের আগ্রহ কমে যায়।

ফলে কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর প্রবণতা বাড়ে।দেশে কর আদায়ের দুর্বলতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের সরকারি ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। বহু বছর ধরেই অর্থনীতিবিদরা বলে আসছেন যে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন, কিন্তু সীমিত রাজস্বের কারণে সরকার প্রয়োজনীয় মাত্রায় ব্যয় করতে পারছে না।

ফলে উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণে কিছু অগ্রগতি হলেও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত গতি অর্জন সম্ভব হয়নি।

কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকার আরেকটি ফল হচ্ছে ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং আইএমএফের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে ঋণের চাপ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পথে, তখন বৈদেশিক সহায়তা ও সহজ শর্তের ঋণ পাওয়ার সুযোগ ধীরে ধীরে কমে যাবে। ফলে নিজস্ব রাজস্বভিত্তি শক্তিশালী করা ছাড়া বিকল্প পথ খুব বেশি নেই।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের সাবেক ডিভিশন ডিরেক্টর জঁ পেমের উদ্ধৃতি দিয়ে ডেইলি স্টার জানিয়েছে, দেশের কিছু করহার সমমানের দেশগুলোর তুলনায় বেশি হলেও প্রকৃত সমস্যা হলো জটিল ও ত্রুটিপূর্ণ করব্যবস্থা। দেশে বিপুল পরিমাণ কর ছাড়, অবকাশ ও বিশেষ সুবিধা রয়েছে, যা প্রায় আদায়কৃত করের সমপরিমাণ রাজস্ব হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ একদিকে সরকার কর সংগ্রহ করতে পারছে না, অন্যদিকে বিভিন্ন খাত ও গোষ্ঠীকে দেওয়া কর ছাড়ের কারণে সম্ভাব্য রাজস্বও হারাচ্ছে।

এছাড়া আমদানি শুল্ক ও সম্পূরক শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করছে। উচ্চ শুল্ক অনেক ক্ষেত্রে শিল্প সুরক্ষার নামে অদক্ষতা তৈরি করে এবং রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করব্যবস্থা অপরিহার্য।

দেশের সম্পদ বৈষম্যও কর সংস্কারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। র‍্যাপিডের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাত্র ১ শতাংশ মানুষের হাতে ৫০ শতাংশেরও বেশি সম্পদ কেন্দ্রীভূত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক অর্থনীতিবিদ সম্পদ কর, উত্তরাধিকার কর বা সম্পদ হস্তান্তরের ওপর কর আরোপের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের মতে, এতে শুধু রাজস্বই বাড়বে না, বরং বৈষম্য কমাতেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

কর ব্যবস্থাকে আধুনিক করার ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশনকে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। আয়, সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন, জমি নিবন্ধন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তথ্যকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা গেলে কর ফাঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বাড়বে।

বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উচ্চ প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি থেকে একটি উন্নত ও টেকসই অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য শক্তিশালী রাজস্বভিত্তি অপরিহার্য। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উঠে আসা পরিসংখ্যান শুধু রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতাই নয়, বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদান ও ইয়েমেনের সামান্য ওপরে অবস্থান করা কোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য স্বস্তির খবর নয়। বরং এটি একটি সতর্কবার্তা যে কর সংস্কার, করের আওতা সম্প্রসারণ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল প্রশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা ভবিষ্যতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

কর-জিডিপি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

জার্মানিতে ‘নব্য-নাৎসিদের উত্থান’ দেখে আতঙ্কিত ইউরোপ, বদলে যাচ্ছে কি রাজনীতির সমীকরণ

🕒 প্রকাশ: ০২:২২ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাহাড়ের আত্মকথা ও মূলধারার সেতুবন্ধন: ‘নির্বাচিত নাটক: মৃত্তিকা চাকমা’

🕒 প্রকাশ: ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর কেন সংক্ষিপ্ত হচ্ছে

🕒 প্রকাশ: ১২:৫১ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বাড়িতে উঠলেন ফুটপাতে বাস করা গোলাপি বেগম

🕒 প্রকাশ: ১২:১৮ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানীতে ৪ এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের পর এবার বাসে আগুন

🕒 প্রকাশ: ১২:০৯ পূর্বাহ্ন, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

Footer Up 970x250