ফাইল ছবি
পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের গভীর উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লি মনে করছে—তিস্তা নদীকেন্দ্রিক এই প্রকল্পে চীনের উপস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক বা অবকাঠামোগত বিষয় নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরকে কেন্দ্র করে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীর সীমান্ত-সংক্রান্ত অবস্থান এবং চীন-তিস্তা ইস্যুকে একই ভূরাজনৈতিক পরিসরের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের নিরাপত্তা-ভাবনায় এখন সীমান্ত, অভিবাসন, নদী ও চীনের প্রভাব—সবকিছু একসূত্রে গাঁথা হয়ে উঠছে।
ভারতীয় কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণকে ভারত কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখছে না। নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে এটি “স্ট্র্যাটেজিক পেনিট্রেশন” বা কৌশলগত অনুপ্রবেশের অংশ। কারণ, তিস্তা নদীর ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের তথাকথিত “চিকেন’স নেক” বা শিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছাকাছি।
এই করিডর ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের একমাত্র স্থল যোগাযোগের পথ। ফলে এই অঞ্চলের আশপাশে চীনের প্রযুক্তিগত, প্রকৌশলগত বা অবকাঠামোগত উপস্থিতিকে ভারত অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে বিবেচনা করে।
ভারতের সামরিক ও কৌশলবিষয়ক বিশ্লেষক ব্রহ্মা চেলানি বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, চীন দক্ষিণ এশিয়ায় নদী, অবকাঠামো ও বন্দরকে কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত তার বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনাকে ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করেন।
তার মতে, চীন যদি তিস্তা প্রকল্পে সক্রিয় ভূমিকা পায়, তবে সেটি কেবল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হবে না; বরং ভারতের কৌশলগত পরিসরে স্থায়ী উপস্থিতির সুযোগ তৈরি করবে।
আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় ভারত নিজেও আগ্রহ দেখিয়েছিল। মূলত চীনের প্রভাব ঠেকানোর উদ্দেশ্যেই নয়াদিল্লি তখন প্রকল্পটিতে সম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। এমনকি শেখ হাসিনা সরকারের সময় ভারতকে তিস্তা মহাপরিকল্পনার দায়িত্ব দেওয়ার কথাও আলোচনায় ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি।
ভারতীয় গণমাধ্যমে এ বিষয়টি নিয়ে এখন দুটি ভিন্ন ধারা দেখা যাচ্ছে। একদল মনে করছে, বাংলাদেশকে চীনের কাছ থেকে দূরে রাখতে ভারতকে আরও নমনীয় ও বাস্তববাদী হতে হবে। অন্যদিকে আরেকটি অংশ মনে করছে, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ভারতের জন্য কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে সাবেক কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশ এখন “মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট” নীতিতে এগোচ্ছে। অর্থাৎ, তারা একইসঙ্গে ভারত, চীন ও পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তার মতে, নয়াদিল্লি যদি কেবল নিরাপত্তা-উদ্বেগের ভিত্তিতে ঢাকা-চীন সম্পর্ককে দেখার চেষ্টা করে, তবে সেটি উল্টো ফল দিতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের নিরাপত্তাবিষয়ক সাময়িকী ও টেলিভিশন বিশ্লেষণগুলোতে আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে রিপাবলিক টিভি ও টাইমস নাউ–এর আলোচনায় তিস্তা প্রকল্পকে “চীনের নতুন স্ট্র্যাটেজিক ফ্রন্ট” হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। এসব আলোচনায় দাবি করা হয়, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের পর চীন এবার বাংলাদেশে নদীকেন্দ্রিক অবকাঠামোকে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
তবে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিস্তা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য একটি সংকটের নাম। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, নদীভাঙন, কৃষি সংকট ও পরিবেশগত বিপর্যয়—সব মিলিয়ে তিস্তা অববাহিকার লাখো মানুষ দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর নদী ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়ে আসছে। ফলে বাংলাদেশ সরকার যে দেশ থেকেই অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা পাক না কেন, তারা মূলত নদী ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এখানে ভারতের অবস্থানকে অনেক বিশ্লেষক দ্বিমুখী বলেও উল্লেখ করছেন। কারণ, একদিকে ভারত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রেখেছে; অন্যদিকে আবার বাংলাদেশ যদি বিকল্প সহযোগী খোঁজে, তখন সেটিকে নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক মহলের একটি অংশ মনে করে, তিস্তা সমস্যার দীর্ঘসূত্রতার পেছনে পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বড় কারণ। ফলে ঢাকা এখন বহুমাত্রিক কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করছে।
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে চীনের ইয়ারলুন সাংপো বা ব্রহ্মপুত্র নদে বাঁধ নির্মাণের প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন উজানে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জন করছে, যা ভারত ও বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই যুক্তি তুলে ধরে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের একাংশ বলছে—বাংলাদেশের উচিত চীনের বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের সামনে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ দিন দিন জটিল হচ্ছে। চীন এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় অবকাঠামোগত অংশীদার। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী এবং নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ঢাকা কোনো পক্ষের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধে না গিয়ে “ব্যালান্সিং ডিপ্লোমেসি” অনুসরণ করছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনীতিতে নদী আর কেবল পরিবেশ বা কৃষির বিষয় নয়; এটি এখন নিরাপত্তা, কৌশল ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তিস্তা প্রকল্পকে ঘিরে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—নিজেদের উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন কোনো বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে পরিণত না হতে হয়।
খবরটি শেয়ার করুন