ফাইল ছবি (সংগৃহীত)
শুধু শিক্ষার্থী নয়, অনেক অভিভাবকেরও স্বপ্ন সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনা করাবেন। এতে সমস্যার কিছু নেই। বিদেশে নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি লাভের স্বপ্ন তারা দেখতেই পারেন। তবে অনেক অভিভাবকের মনে সন্তান শুধু সেখানে অধ্যায়ন করবে, বড় বড় ডিগ্রি নেবেন এমনই নয়। তাদের মধ্যে সুপ্ত একটি ইচ্ছে থাকে সন্তানরা সেখানে (বিদেশে) প্রতিষ্ঠিতও হোক। এ কারণে অনেক অর্থ খরচ করে তাদের সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে দেন। পড়াশোনা শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে না পারলেও চাকরির সংস্থানতো হবেই।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকেও প্রচুর শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যাচ্ছেন। অভিভাবকরাও বিভিন্ন কারণে চাইছেন সন্তানরা সেখানেই পড়াশোনা করুক, সম্ভব হলে প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে কী হচ্ছে- ভারতীয় গণমাধ্যমে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি সংবাদে তা প্রকাশ পেয়েছে। ইমিগ্রেশন নিউজ-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ‘ইমিগ্রেশন, রিফিউজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডাবা'-আইআরসিসি জানিয়েছে শুধু সেই দেশে পড়তে গিয়ে ৩৫৯,৭৮১ জন ভারতীয় শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীর কোনও খোঁজ নাকি পায়নি সে দেশের সরকার।
তবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বেলায় কী হচ্ছে তা এ রিপোর্টে না থাকলেও নিখোঁজ ভারতীয় শিক্ষার্থীদের বেলায় বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য কানাডায় পৌঁছানোর পর তারা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করাননি। এই সব ‘নিখোঁজ' ছাত্রদের অনেকেই আইআরসিসি-কে না জানিয়েই কলেজ পরিবর্তন করেছেন। অনেকে আবার পড়াশোনা ছেড়ে কানাডাতেই কাজ করা শুরু করেছেন। তাই তাদের তথ্য দিতে পারেনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি। আর আইআরসিসি-র পরিসংখ্যান পুরোপুরি নির্ভর করে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির দেওয়া তথ্যের উপরেই।
বিদেশে নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি লাভের স্বপ্ন অনেক পড়ুয়াই দেখেন। পছন্দের দেশগুলির মধ্যে অন্যতম কানাডা। বিদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়ার ক্ষেত্রে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের সময় অনেকেরই ঝোঁক থাকে কানাডার দিকে। প্রতি বছরই লক্ষ লক্ষ ভারতীয় ছাত্র উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ করতে কানাডায় পাড়ি দেন। কেন্দ্রীয় সরকারের গত অগস্ট মাসের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৩ লাখ ৩৫ হাজার ভারতীয় পড়ুয়া বর্তমানে বিদেশে পাঠরত। তার মধ্যে শুধু কানাডাতেই ৪ লাখের উপরে।
শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২৬০ শতাংশ। গত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, সে দেশে যাওয়া বিদেশি পড়ুয়াদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই ভারতীয়। ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, সে দেশের মোট বিদেশি পড়ুয়ার অন্তত ৩৭ শতাংশই ভারতীয়।
২০২৫ সাল থেকে স্টুডেন্ট ভিসা ১০ শতাংশ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাস্টিন ট্রুডোর সরকার। এরই মাঝে আরও এক সমস্যার সূত্রপাত হয়েছে ভারতীয় ছাত্রদের নিয়ে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে, কানাডায় আসার পর প্রায় ২০ হাজার ভারতীয় শিক্ষার্থীর কোনও খোঁজ নাকি পায়নি সে দেশের সরকার। এই শিক্ষার্থীরা কোথায় আছেন তার কোনও রেকর্ড কানাডা সরকারের কাছে নেই।
টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডায় থাকার খরচ বহন করার জন্য বেশির ভাগ শিক্ষার্থী স্টুডেন্ট ভিসার অপব্যবহার করে ভিন্ন ধরনের সব চাকরি বেছে নিয়েছেন। আর এদের মধ্যে যারা সত্যিই পড়াশোনা করার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করে এ দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা পড়েছেন বিপদে। এরমধ্যে অনেক ভারতীয় পড়ুয়াই বিদেশি ডিগ্রি লাভের আশায় স্বল্পপরিচিত কলেজগুলির ভর্তির প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। আর এখানেই ঘটেছে বিপত্তি। কানাডায় গিয়ে ভর্তির সময় তারা কলেজে যোগাযোগ করতে গিয়ে আবিষ্কার করেছেন এই কলেজগুলির অধিকাংশই ভুয়া। আবার কিছু কলেজে সমস্ত আসন ভর্তি হয়ে গিয়েছে।
এই ধরনের জালিয়াতির ঘটনায় ভুক্তভোগী হরিয়ানার পঞ্চকুলার ২৪ বছর বয়সি এক ছাত্র। তিনি কানাডায় পৌঁছোনোর পর ব্র্যাম্পটনের একটি কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে হতবাক হয়ে যান। তার ভর্তির চিঠিতে যে ঠিকানা লেখা ছিল সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন সেটি কোনও কলেজ নয়, একটি ছোট অফিস মাত্র।
সেখানে তাকে বলা হয় সমস্ত আসন ভর্তি। তাকে অপেক্ষা করতেও বলা হয়। এক সপ্তাহ কেটে গেলেও সেখান থেকে ভর্তির ডাক আসেনি। তখন ওই ছাত্র বুঝতে পারেন কলেজটি জাল। বছরে মোট ১২ লক্ষ টাকার টিউশন ফি থেকে ৪.২ লক্ষ টাকা জমা দিয়েছিলেন। তার হাতে বিশেষ টাকা না থাকায় নিজের খরচ চালানোর জন্য স্থানীয় একটি পেট্রল পাম্পে কাজ শুরু করেন।
গুজরাতের বলসাডের ২৭ বছর বয়সি যুবক স্বীকার করেছেন যে, তিনি দু’বছরের জন্য সাড়ে সাত লক্ষ টাকা ফি দিয়ে একটি কমিউনিটি কলেজে ভর্তি হয়েছেন। কানাডায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য পড়াশোনা করতে যে খরচ লাগে, কমিউনিটি কলেজে খরচ তার চেয়ে কম। তবে এটি বিদেশের ছাত্রদের জন্য অবৈধ।
কানাডায় বহু ছাত্র রয়েছেন যাদের মাথার উপর ২০ থেকে ২৫ লক্ষ টাকার ঋণের বোঝা চেপে রয়েছে। সেই ঋণ শোধ করার জন্য বেআইনিভাবে উপার্জন করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অনেক ভারতীয় শিক্ষার্থীই কানাডায় আসার পর বুঝতে পেরেছেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাওয়ার পর তারা সেখানে ‘ওয়ার্ক পারমিট’ বা চাকরির ছাড়পত্র পাবেন না। কানাডায় ওয়ার্ক পারমিট না থাকলে বৈধভাবে কোথাও কাজ করা সম্ভব নয়।
মূলত গুজরাত, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যগুলি থেকে সে দেশে যাওয়া ছাত্রদের অধিকাংশই অন্তত দু’টি শিফ্টে চাকরি করেন। কেউ রেস্তরাঁ, কেউ ডেলিভারি সংস্থার কর্মী হিসাবে কাজ করে থাকেন ও ঘণ্টায় ডলারের হিসাবে রোজগার করেন।
কিছু শিক্ষার্থী কলেজের দ্বারা প্রতারিত হলেও, অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে কানাডায় পাড়ি জমান মোটা রোজগারের আশায়। আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে হলে পড়ার খরচ পুরোপুরি জমা দিলে তবেই সে দেশের কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার অনুমতি পাওয়া যায়।
কানাডায় বিদেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের আগে থেকে পুরো টিউশন ফি জমা দিতে হয় না। এই নীতির কারণে পড়তে আসার নাম করে শিক্ষার্থীরা বড় বড় শহরে অবৈধভাবে বিভিন্ন কাজ করতে শুরু করেন। বেশ কিছু ছাত্র অবৈধভাবে আমেরিকায় প্রবেশের জন্য কানাডাকে প্রবেশদ্বার হিসাবে ব্যবহার করেন। ভিসা ছাড়া বেআইনিভাবে ভারতীয়দের আমেরিকায় পাঠানোর কাজে জড়িত একাধিক চক্র।
কানাডা সীমান্ত হয়ে ভারতীয়দের অবৈধভাবে আমেরিকায় প্রবেশ করানোর চক্রের কথা অতীতেও বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে। ইডির দাবি, এই চক্রের সঙ্গে কানাডার কিছু কলেজ এবং ভারতের বেশ কয়েকটি সংস্থা জড়িত। যারা অবৈধভাবে আমেরিকায় প্রবেশ করতে চাইতেন, তাদের আগে কানাডার কিছু কলেজে ভর্তি করানোর ‘ব্যবস্থা’ করা হতো। তাদের জন্য করা হতো কানাডার স্টুডেন্ট ভিসাও।
কিন্তু কানাডায় পৌঁছনোর পর কলেজে ভর্তি করানোর বদলে কানাডা সীমান্ত দিয়ে বেআইনিভাবে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হতো আমেরিকায়। এই চক্রে এক এক জন ভারতীয়র কাছ থেকে ৫৫-৬০ লাখ টাকা করে নেওয়া হতো বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের।
অর্থনীতিবিদ এবং অভিবাসন বিশেষজ্ঞ হেনরি লটিন সংবাদমাধ্যমে জানান, তার ধারণা নিখোঁজ ভারতীয় ছাত্রদের বেশির ভাগই সীমান্ত পেরিয়ে আমেরিকায় প্রবেশ করতে পারেননি। তারা এখনও কানাডায় কাজ করছেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য অপেক্ষা করছেন।
সূত্র : আনন্দবাজার
কেসি/ আই.কে.জে