ছবি: সংগৃহীত
নিজেদের 'প্রথা' নিজেরাই ভাঙলেন দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের সম্পাদক যথাক্রমে মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম। রাজনীতিবিদদের আয়োজিত মতবিনিময় সভা, এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের মতো অনুষ্ঠান তারা সাধারণত এড়িয়ে চলতেন। তবে রোববার (২১শে ডিসেম্বর) বিএনপির আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তারা অংশ নেন স্বাচ্ছন্দ্যে।
শুধু তাই নয়, একসময় বিএনপির 'কঠোর সমালোচক' এই দুই সম্পাদক বিএনপি ও দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে ভূয়সী প্রশংসা করেন। যা তারা অতীতে আর কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কখনো করেননি।
দুই সম্পাদকই অতীতে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে গণমাধ্যমের প্রতি দলটির সরকারের 'সহনশীল ও স্বস্তিকর' দৃষ্টিভঙ্গির যে 'সনদপত্র' দিয়ে এসেছেন, সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও তথ্যের সঙ্গে এর মিল পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে মাহফুজ আনাম বক্তব্যে অসত্য তথ্য উপস্থাপন করেছেন।
মতিউর রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে আগামীর প্রধানমন্ত্রী বিবেচনায় বক্তব্য রেখেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা যেভাবে তার প্রশংসা করতেন, মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমান রোববার তা-ই করলেন তারেক রহমানের।
বিএনপির ওই অনুষ্ঠানে মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানের দেওয়া বক্তব্যের ভিডিও এর মধ্যে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের বক্তব্যে অনেক নেটিজেন বিস্ময় প্রকাশ করছেন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের পাঠকনন্দিত দুটি দৈনিক পত্রিকার এই সম্পাদকদের বিএনপির প্রতি মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসাকে নানা বিশ্লেষণ করছেন নেটিজেনেরা।
অনেকে এমন প্রশ্ন সামনে এনেছেন, তাহলে কি মাহফুজ আনাম ও মতিউর জুতার কারখানার ম্যানেজার হয়ে উঠছেন? তারা কি বিএনপির জনসংযোগ কর্মকর্তায় পরিণত হচ্ছেন?
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি মাহফুজ আনামের লেখা একটি উপসম্পাদকীয় ছাপা হয় ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে। এর শিরোনাম ছিল 'এডিটরস ডোন্ট বিকাম পিআরস অব প্রোপাইটরস: হাউ সাম এডিটরস আর ডেসট্রয়িং দ্য এডিটোরিয়াল ইনস্টিটিউশন' (সম্পাদক, মালিকের জনসংযোগ কর্মকর্তায় পরিণত হবেন না: কীভাবে ‘সম্পাদকের প্রতিষ্ঠান’ ধ্বংস করছেন সম্পাদকেরাই)।
এতে মাহফুজ আনাম বলেন, জুতার কারখানা ও ওষুধ কারখানার মালিকানা আর গণমাধ্যমের মালিক হওয়া এক বিষয় নয়। আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির মধ্য দিয়ে একজন সম্পাদকের জুতার কারখানার ম্যানেজার হয়ে ওঠা উচিত নয়। কিন্তু দেশের অনেক সম্পাদক জুতার কারখানার ম্যানেজার হয়ে 'সম্পাদকের প্রতিষ্ঠান’ ধ্বংস করছেন।
মাহফুজ আনামের পুরনো কলামের সূত্র ধরে নেটিজেনদের প্রশ্ন, তারাও কি জুতার কারখানার ম্যানেজার, বা বিএনপির জনসংযোগ কর্মকর্তায় পরিণত হচ্ছেন? তারা একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে এভাবে কথা বললে কি আত্মমর্যাদা বিসর্জন দেওয়া হয় না? যা নিজেরাই মানতে পারেন না, ওই পরামর্শ তারা দেশের অন্য সম্পাদকদের কেন দেন?
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমান বক্তব্য দেন। রোববার দুপুরে র্যাডিসন ব্লু হোটেলে দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক, রেডিও-টেলিভিশনের বার্তাপ্রধান এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে এ সভার আয়োজন করে ‘তারেক রহমান-স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কমিটি’। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির আহ্বায়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারির উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম বলেন, তিনি ১৯৭২ সাল থেকে সাংবাদিকতা এবং ১৯৯৩ সাল থেকে সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার মতে, ‘এতো বছরের অভিজ্ঞতায় গভীর দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, সম্পাদকেরা তাদের পদের মর্যাদা বাড়ানো, শক্তিশালী করা ও সম্মান বাড়ানোর পরিবর্তে ঠিক বিপরীত কাজ করছেন। তারা মালিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করে সাংবাদিকতা পেশার সম্মান নষ্ট করছেন। প্রতিষ্ঠানকে কলঙ্কিত করছেন ও অপমানজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছেন।’
তিনি বলেন, ‘একজন সম্পাদক হওয়ার পূর্বশর্ত শুধু লেখা, সম্পাদনা, পরিচালনা, নেতৃত্ব দেওয়া ও সাংবাদিকদের দিকনির্দেশনা দেওয়া বা অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি থাকা নয়। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত আত্মমর্যাদা, ব্যক্তিগত দৃঢ়তা, সাহস ও সম্মানবোধ থাকতে হবে, যাতে তার নিয়ন্ত্রণাধীন গণমাধ্যমকে কখনোই মিথ্যা, মানহানি বা ঘৃণা ছড়ানোর জন্য ব্যবহার করা না হয়।’
ডেইলি স্টারের ওই কলামে তিনি সম্পাদকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘সম্পাদকদের প্রতি অনুরোধ, অনুগ্রহ করে সম্মান বিসর্জন দেবেন না এবং মালিকদের জনসংযোগ কর্মকর্তায় পরিণত হবেন না।’
বিএনপির অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, দেশে একটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা বিপজ্জনক। এ প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের আরও আগে দেশে ফেরা সম্ভব হলে বিএনপি ও দেশের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হতে পারত। শূন্যতা পূরণ হত। তারেক রহমানের অনুপস্থিতি বিএনপির জন্য নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি করেছে। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অনেক বেশি ভোট পেয়ে সরকার গঠন করবে।
তিনি বলেন, বিএনপির শাসনামলে সংবাদপত্র খুব স্বস্তিতে ছিল—এমন দাবি তিনি করছেন না। তবে তুলনামূলকভাবে সে সময়টি ছিল কিছুটা বেশি সহনশীল। অন্যদিকে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের ১৫-১৬ বছরে সংবাদপত্র শিল্প সবচেয়ে বেশি ভীতি ও চাপের মধ্য দিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মতিউর রহমান বলেন, ভবিষ্যতে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে শুধু সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেই হবে না; সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে একটি জাতীয় ঐক্য ও সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করা। এত বিভক্ত সমাজ নিয়ে কোনো দেশ এগোতে পারে না।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা নেওয়া সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়ে আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর মুক্তি পেয়েছিলেন তারেক রহমান। এরপর ১১ই সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা ছেড়েছিলেন তিনি।
বিএনপির প্রয়াত নেতা মওদুদ আহমদ তার 'কারাগারে কেমন ছিলাম (২০০৭-২০০৮)' বইতে লিখেছেন, "এমনও হতে পারে, তিনি (খালেদা জিয়া) জেনারেলদের সাথে এই সমঝোতা করেছিলেন যে, তারেক রহমান আপাতত নিজেকে রাজনীতিতে জড়াবেন না এবং এ মর্মে তারেক রহমান কোনো সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরও দিয়ে থাকতে পারেন।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফলে তারেক রহমানের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি শক্তিগুলো তার অনুকূলে ছিল না দীর্ঘ বছর ধরে। গত সময়ে আওয়ামী লীগ একটানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় ছিল। ফলে আওয়ামী লীগের আমলে সাংবাদিক নির্যাতন ও নিপীড়ন পরিসংখ্যান গত দিক থেকে বিএনপির চেয়ে বেশি। তবে নির্যাতনের মাত্রায় কোনো দলই পিছিয়ে নেই।
বিএনপির শাসনামলে (১৯৯১-২০০৬) সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির সাপ্তাহিক বিচিত্রাসহ অনেকে চাকরিচ্যুত হন সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে। ভুয়া মামলায় এই সময় গ্রেপ্তার হন দৈনিক জনকণ্ঠ, আজকের কাগজের সম্পাদকসহ আরো কয়েকজন। এ সময় সাংবাদিক শফিক রেহমান, আসিফ নজরুল (বর্তমান আইন উপদেষ্টা), কবি ফরহাদ মজহারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়।
বিএনপির শাসনামলে (২০০১-২০০৬) বেসরকারি একুশে টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করে সরকার। এ সময় সাংবাদিক হত্যার তালিকা দীর্ঘ হয়। প্রথম আলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা দায়ের করেন ওই সরকারের কয়েক মন্ত্রী। কারাগারে যেতে হয় সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, সালিম সামাদ, প্রিসিলা নাজ ও অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনকে। খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামলে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন দ্বিখণ্ডিত হয় ওই সময়ের তথ্যমন্ত্রীর ইন্ধনে।
বিএনপির অনুষ্ঠানে দলটির প্রশংসা করে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, 'বাংলাদেশের ৫৩ বছরের বয়সে কখনো কোনো মিডিয়া অফিসে আগুন দেওয়া হয়নি। প্রথমবারের মতো প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে আগুন জ্বালানো হয়েছে। কেন? আমরা কী অপরাধ করেছি? এটা সমস্ত মিডিয়ার প্রশ্ন করা উচিত।'
তার এই দাবি সঠিক নয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলন চলাকালে বিটিভি, একাত্তর টিভিসহ বেসরকারি কয়েকটি টিভি চ্যানেলের কার্যালয় ভবনে আগুন লাগিয়ে দেন বিক্ষুব্ধেরা। ২০১৩ সালে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে দৈনিক নয়া দিগন্তের কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
খবরটি শেয়ার করুন