ছবি: সংগৃহীত
ব্রাজিলের রাজনীতিতে বলসোনারো পরিবারের নামের সঙ্গে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। সেই নাম ও পারিবারিক রাজনৈতিক ভিত্তিই এখন ৪৫ বছর বয়সী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর সবচেয়ে বড় শক্তি। একই সঙ্গে এটিই তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, তিনি যে রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তরাধিকারী হতে চাইছেন, সেটি মূলত তার বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ব্যক্তিত্ব, আগ্রাসী রাজনৈতিক ভাষা ও বিতর্কিত কৌশলকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল।
৪ অক্টোবর ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রথম দফায় কোনো প্রার্থী বৈধ ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি না পেলে ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফা ভোট হবে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এখন ফ্লাভিও বলসোনারোর নামই সামনে রয়েছে। গতকাল সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম দফার জরিপে লুলা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফায় দুজনের ব্যবধান পরিসংখ্যানগতভাবে খুবই কম।
তবে নির্বাচনের এই পর্যায়ে ফ্লাভিওর অবস্থান শুধু ভোটের হিসাব দিয়ে বোঝা কঠিন। তার লড়াই একই সঙ্গে বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখা এবং নিজের আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াই।
বার্তা সংস্থা এএফপি এক প্রতিবেদনে ফ্লাভিওকে ‘বাবার ছায়ায় থাকা রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী’ হিসেবে তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাবার নাম ও শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেলেও জইর বলসোনারো যেভাবে ডানপন্থী রাজনীতিকে উজ্জীবিত করেছিলেন, সেই একই ধরনের আগুনঝরা রাজনৈতিক ধরন ফ্লাভিওর মধ্যে নেই। ফলে বাবার জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করেও তাকে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে হচ্ছে।
ফ্লাভিওর রাজনৈতিক জীবনের শুরু অবশ্য বেশ আগে। তিনি ২০০৩ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে রিও ডি জেনেইরোর রাজ্য আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হন। ২০১৯ সাল থেকে তিনি সিনেটর। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের তথ্য অনুযায়ী, তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সময়কাল এখন প্রায় ২৩ বছর। আইন বিষয়ে পড়াশোনা করা ফ্লাভিওকে তার বাবার চার ছেলের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে দীর্ঘদিন সক্রিয় ব্যক্তিদের একজন হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা সবসময় তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল না। পরিস্থিতি বদলে যায় যখন জইর বলসোনারো নিজেই ছেলেকে তার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে সামনে আনেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জইর ঘোষণা করেন, ফ্লাভিও তার রাজনৈতিক প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পেয়েছেন। এর পর থেকেই ফ্লাভিওর রাজনৈতিক পরিচয় অনেকটাই ‘জইর বলসোনারোর উত্তরসূরি’ হিসেবে তৈরি হতে থাকে।
ফ্লাভিও নিজেও বাবার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি আড়াল করেন না। তিনি নিজেকে তুলনামূলকভাবে ‘মধ্যপন্থী বলসোনারো’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। আবার একই সঙ্গে বলেন, তার বাবা তার দিকনির্দেশক ও আদর্শ। রিও ডি জেনেইরোর এক নির্বাচনী সমাবেশে নিজের চেহারার সঙ্গে বাবার মিলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দেখতে তিনি বাবার মতো হলেও পেলের ছেলের সঙ্গে পেলের তুলনা হয় না। অর্থাৎ, বাবার জনপ্রিয়তা তিনি ব্যবহার করতে চান, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ও প্রতিষ্ঠা করতে চান।
এই দ্বৈত কৌশলই ফ্লাভিওর প্রচারণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তিনি বাবার তুলনায় নিজেকে বেশি বাস্তববাদী ও মধ্যপন্থী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তবে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান, সামাজিক ইস্যুতে রক্ষণশীল অবস্থান এবং বাজারমুখী অর্থনৈতিক ধারণার ক্ষেত্রে তার নীতিতে বাবার সঙ্গে যথেষ্ট মিল রয়েছে।
অপরাধ দমন ফ্লাভিওর প্রচারণার অন্যতম প্রধান বিষয়। তিনি এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের কঠোর নিরাপত্তা নীতির প্রশংসা করেছেন। ব্রাজিলে আরও বেশি কারাগার নির্মাণের কথাও বলেছেন। ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং বুকেলের মডেলের প্রতি সমর্থন তার প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই অবস্থানকে তিনি প্রচারণার দৃশ্যমান উপকরণেও ব্যবহার করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি প্রচারচিত্রে তাকে যুদ্ধবিমানের পাইলটের পোশাকে দেখা যাচ্ছে। একটি ভিডিওতে তাকে বিমানের জানালা দিয়ে ঝুঁকে নৌকায় থাকা মাদক পাচারকারীদের দিকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। এর মাধ্যমে তিনি অপরাধের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের একটি নাটকীয় রাজনৈতিক ছবি তৈরি করছেন।
তবে ফ্লাভিওর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তার রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো। চলতি সেপ্টেম্বরেই ‘ডার্ক হর্স’ নামের জইর বলসোনারোর জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্রের অর্থায়ন নিয়ে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। ব্রাজিলের সরকারি বার্তা সংস্থা এজেন্সিয়া ব্রাজিল জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আন্দ্রে মেন্ডনসা চলচ্চিত্রটির অর্থায়ন নিয়ে ফ্লাভিওর সংশ্লিষ্টতা তদন্তের জন্য পুলিশি তদন্তের অনুমতি দিয়েছেন। তদন্তে প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ ব্রাজিলীয় রিয়ালের অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি রয়েছে।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ফোলহা দে সাও পাওলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশি নথিতে ফ্লাভিওকে চলচ্চিত্রটির অর্থায়নের বিষয়ে সাবেক ব্যাংকার ড্যানিয়েল ভরকারোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারোর নামও তদন্তে এসেছে।
এই ঘটনায় নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। ফ্লাভিও এর আগে ভরকারোর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন বলে এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের পর তার অবস্থানে পরিবর্তন আসে। তবে তদন্ত চলমান থাকা এবং অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া—দুটিই আলাদা বিষয়।
এর বাইরেও ফ্লাভিওর রাজনৈতিক অতীত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। রিও ডি জেনেইরোর আইনপ্রণেতা থাকাকালে তার সহযোগীদের বেতন থেকে অর্থ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। ওই মামলাটি পরে খারিজ হয়। স্থানীয় সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ নিয়েও বহু বছর ধরে প্রশ্ন রয়েছে। এসব অভিযোগ তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেললেও এগুলোর আইনগত অবস্থান এক নয়।
পারিবারিক বিরোধও ফ্লাভিওর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল বলসোনারো তার বিরুদ্ধে অসম্মানজনক আচরণের অভিযোগ তুলেছিলেন। রয়টার্স জুলাইয়ে জানিয়েছিল, এই বিরোধ বিশেষ করে নারী ভোটারদের কাছে ফ্লাভিওর প্রচারণাকে জটিল করে তুলেছিল। মিশেল বলসোনারো রক্ষণশীল ও ধর্মপ্রাণ নারী ভোটারদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখেন। পরে দুজনই প্রকাশ্যে ক্ষমা চান এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন।
এখানে বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। জইর বলসোনারোর জনপ্রিয়তা শুধু তার নিজের ভোটের ভিত্তি নয়। তার স্ত্রী, সন্তান এবং ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীরাও সেই ভিত্তির বিভিন্ন অংশ ধরে রেখেছেন। ফলে পরিবারের ভেতরের দ্বন্দ্ব সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
জইর বলসোনারো নিজে এখন নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারছেন না। ২০২২ সালের নির্বাচনে হারের পর ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত অভ্যুত্থান মামলায় তিনি দণ্ডিত হয়েছেন এবং বর্তমানে গৃহবন্দী অবস্থায় আছেন। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাকে ২৭ বছর তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণায় বাবার সঙ্গে তার যোগাযোগও আদালতের বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছে।
ফলে ফ্লাভিওর প্রচারণায় জইর একই সঙ্গে অনুপস্থিত এবং উপস্থিত। তিনি ব্যালটে নেই, কিন্তু তার ছবি, বক্তব্য, রাজনৈতিক দর্শন এবং অনুসারীদের মধ্যে তার প্রভাব পুরো প্রচারণায় রয়েছে। জুলাইয়ে ফ্লাভিওর আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ঘোষণার সময় তার বাবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বার্তাও প্রচারণার অংশ ছিল। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইও অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে তাকে সমর্থন জানান।
ফ্লাভিও এখন সেই উত্তরাধিকারকে আরও বিস্তৃত ভোটভিত্তিতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তার সমস্যা হলো, শুধু বলসোনারো পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখলেই মধ্যপন্থী ভোটারদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। আবার বাবার মূল সমর্থকদের ধরে রাখতে গিয়ে অতিরিক্ত মধ্যপন্থী হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এই ভারসাম্যই তার প্রচারণার অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
জনমত জরিপে এরই মধ্যে সেই প্রতিযোগিতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত কুয়েস্ত জরিপে প্রথম দফায় লুলা ৩৭ শতাংশ এবং ফ্লাভিও ৩৩ শতাংশ সমর্থন পান। সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফায় ফ্লাভিও ৪২ এবং লুলা ৪১ শতাংশে ছিলেন, যা জরিপের ভুলসীমার মধ্যে। ২৮ সেপ্টেম্বর রয়টার্সও জানায়, দুটি সাম্প্রতিক জরিপে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফায় দুজনের ব্যবধান পরিসংখ্যানগতভাবে খুব কম।
তবে এসব জরিপকে নির্বাচনের ফল হিসেবে দেখা যাবে না। ব্রাজিলের প্রথম দফার ভোট এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। আর প্রথম দফায় একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় দ্বিতীয় দফার হিসাব আলাদা রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসের মতো কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনী ফল অনুমান না করে বলা যায়, ফ্লাভিওর সামনে এখন মূল প্রশ্ন হলো—তিনি কি শুধু জইর বলসোনারোর রাজনৈতিক নামের উত্তরাধিকারী হয়ে থাকবেন, নাকি সেই ভিত্তির ওপর নিজের একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলতে পারবেন। এএফপির বিশ্লেষণেও এই দ্বন্দ্বই উঠে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক থমাস ট্রাউমানের মতে, ফ্লাভিও তার বাবার তুলনায় বেশি মিশুক ও বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও এর অর্থ এই নয় যে তার আদর্শগত অবস্থান ডানপন্থী রাজনীতির মূল স্রোত থেকে সরে গেছে।
অন্যদিকে, ডয়চে ভেলে ও ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফ্লাভিওর প্রচারণায় একই সঙ্গে দুটি বার্তা কাজ করছে—একদিকে বাবার রক্ষণশীল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখা, অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য ও বাস্তববাদী ভাবমূর্তি তৈরি করা।
এই কারণে ব্রাজিলের আসন্ন নির্বাচন শুধু লুলা ও ফ্লাভিওর ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। এর মধ্যে রয়েছে জইর বলসোনারোর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কতটা টেকসই, সেই প্রশ্নও। ফ্লাভিওর সাফল্য নির্ভর করবে তার বাবার শক্তিশালী ভোটভিত্তি ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন ভোটার ও মধ্যপন্থী অংশের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হতে পারেন তার ওপর। আর তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং কঠোর নিরাপত্তানীতির অবস্থান—সবকিছু মিলিয়েই তাকে এখন বাবার ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
খবরটি শেয়ার করুন