ছবি: সংগৃহীত
দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিদেশ থেকে অর্থ পাঠানো, ফ্রিল্যান্সিংয়ের পারিশ্রমিক গ্রহণ কিংবা আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুবিধার কারণে অনেক মানুষ এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন। তবে একই সঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, এই বৈধ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কিছু অপরাধী, জঙ্গি ও চরমপন্থী গোষ্ঠীও অর্থ আদান-প্রদানের চেষ্টা করছে। ফলে দেশের আর্থিক নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের সামনে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
কানাডাভিত্তিক নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেকডেভের প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উদ্বেগের বিষয়টি কেবল ক্রিপ্টোকারেন্সি নয়; বরং বৈধ আর্থিক লেনদেনের ভেতরে অবৈধ অর্থের প্রবাহ শনাক্ত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। সাধারণ ব্যবহারকারীরা যেসব ডিজিটাল মাধ্যমে বিদেশ থেকে অর্থ গ্রহণ করেন, একই ধরনের ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে অপরাধচক্রও অর্থ স্থানান্তরের চেষ্টা করতে পারে।
প্রতিবেদনে একটি সম্ভাব্য লেনদেন পদ্ধতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ জমা দেওয়ার পর তা অনলাইন পিয়ার-টু-পিয়ার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্টেবলকয়েনে রূপান্তর করা সম্ভব। পুরো প্রক্রিয়াটি অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। কিন্তু এই লেনদেনের একটি অংশ দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সরাসরি নজরদারির বাইরে থেকে যেতে পারে।
দেশে এখনো কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল সম্পদে বিনিয়োগ ও লেনদেনের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবু বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অনেকেই ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের একটি অংশ, ফ্রিল্যান্সার এবং আন্তর্জাতিক অনলাইন সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এর ব্যবহার বাড়ছে।
সেকডেভের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই একই অবকাঠামো বিভিন্ন ধরনের অর্থ স্থানান্তরে ব্যবহৃত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বৈধ রেমিট্যান্স, ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয়, অবৈধ হুন্ডি, অনলাইন জুয়ার অর্থ, প্রতারণামূলক বিনিয়োগের অর্থ, অর্থ পাচার এবং চরমপন্থী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অর্থায়ন। তবে প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, অধিকাংশ লেনদেনই বৈধ এবং বৈধ ব্যবহারকারীদের কার্যক্রমই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
সমস্যা হচ্ছে, একটি লেনদেন বৈধ নাকি অবৈধ—তা অনেক ক্ষেত্রে সহজে নির্ধারণ করা যায় না। মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল স্থানীয় মুদ্রার লেনদেন দেখতে পায়। অন্যদিকে বিদেশভিত্তিক ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মগুলো ডিজিটাল সম্পদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। ফলে পুরো লেনদেনের চিত্র একসঙ্গে কোনো একক সংস্থার কাছে থাকে না। এই সীমাবদ্ধতাই তদন্তকে জটিল করে তোলে।
দেশে অতীতেও জঙ্গি অর্থায়নের বিভিন্ন ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে। নিষিদ্ধ সংগঠন আনসার আল-ইসলামের বিরুদ্ধে আগেও বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং তা বিভিন্ন উপায়ে দেশে আনার অভিযোগ তদন্ত হয়েছে। সেকডেভের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজনের জিজ্ঞাসাবাদে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের তথ্য সামনে আসে। তাদের দাবি ছিল, বিদেশ থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ পেয়ে পরে তা অন্যভাবে ব্যবহার করা হতো। যদিও প্রতিটি ঘটনার বিচারিক নিষ্পত্তি ও অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ আদালতের বিষয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গিবাদ দমনে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য সন্দেহে গ্রেপ্তার, প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সন্ধান এবং অনলাইন প্রচারণা পরিচালনাকারীদের আটক করার খবর দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইনভিত্তিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সদস্য সংগ্রহ ও অর্থ লেনদেনের বিষয়টি এখন তদন্তকারীদের অন্যতম গুরুত্বের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। তারা এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতির পাশাপাশি ডিজিটাল ফরেনসিক, ব্লকচেইন বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
সেকডেভের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এককভাবে এই সমস্যার মুখোমুখি নয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশকে ঘিরে একটি বিস্তৃত আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যেখানে মোবাইল মানি, অনলাইন মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম এবং স্টেবলকয়েন ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ রয়েছে। এই বাস্তবতায় কোনো একটি দেশের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নাও হতে পারে। বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোকে বেশি কার্যকর বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
প্রতিবেদনটি একই সঙ্গে সতর্ক করেছে, অতিরিক্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে বৈধ ব্যবহারকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সারদের আয় কিংবা বৈধ আন্তর্জাতিক লেনদেন বাধাগ্রস্ত হলে তার অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে দেশের প্রচলিত আইন ডিজিটাল সম্পদের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ভবিষ্যতে আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে কি না, সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে একটি বিষয় নিয়ে গবেষকেরা প্রায় একমত—প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সহজ করছে, তেমনি অপরাধী চক্রও নতুন সুযোগ খুঁজে নিচ্ছে। তাই প্রযুক্তিকে শত্রু হিসেবে না দেখে এর ঝুঁকি বোঝা, কার্যকর নজরদারি গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
খবরটি শেয়ার করুন