ছবি: সংগৃহীত
বৃহস্পতিবার (১৮ই ডিসেম্বর) দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ঢাকার কারওয়ান বাজারের কার্যালয়ে নজিরবিহীন হামলা, ভাংচুর এবং পত্রিকা দুটির কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার আগেও বর্তমান সরকারের আমলে দুটি গণমাধ্যমের কার্যালয়ই একাধিকবার আক্রান্ত হয়েছে।
এই সরকারের আমলে পত্রিকা দুটির ভবনে আক্রমণের চেষ্টা, ভবনকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার জন্য উসকানি এবং কার্যালয়গুলোর সামনে গরু জবাই করে উগ্রগোষ্ঠীর জেয়াফৎ আয়োজন ও মব সৃষ্টি করাকে একধরনের 'সাধারণ নির্যাতন' হিসেবে বর্ণনা করেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। তার মতে, এগুলো সরকারবহির্ভূত বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাজ।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামেরও এই বিষয়ে বক্তব্য প্রায় একই রকম। অভিজ্ঞদের মতে, আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে পত্রিকা দুটি নিপীড়নের শিকার হওয়ার ঘটনাগুলোকে বড় অপরাধ হিসেবে তুলে ধরতেই বর্তমান সরকারের আমলে ঘটা ঘটনাগুলোকে 'সাধারণ নির্যাতন' হিসেবে দুই সম্পাদক একাধিকবার তুলে ধরেছেন।
গত আওয়ামী লীগের সরকারের মতো বর্তমান সরকারের আমলে ডেইলি স্টার সরকারের 'রোষানলের কবলে' না পড়ায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের ‘আজীবন শুভাকাঙ্ক্ষী’ হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দেন মাহফুজ আনাম। গত ১৮ই এপ্রিল ডেইলি স্টারে 'আনহেলদি ইলেকশন কন্ট্রুভার্সি মাস্ট বি রিসলভড' শিরোনামে প্রকাশিত এক কলামে তিনি এ ঘোষণা দেন।
এ দেশের আর কোনো সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের কোনো সরকারের পক্ষে কলাম লিখে এভাবে ঘোষণা দেওয়ার নজির নেই। আরেক লেখায়, তিনি ‘আমরা গণমাধ্যম হিসেবে আমাদের নৈতিকতার ভিত্তিতে তার (ড. ইউনূস) পাশে থাকব’ বলে ঘোষণা দেন।
দুটি পত্রিকারই দাবি, প্রকাশনা শুরু হওয়ার পর এই পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হয়েছে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে। অবশ্য কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া ও প্রকাশনা একদিনের জন্য বন্ধ রাখতে বাধ্য হওয়ার পর অন্যান্য সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলে নিপীড়নের কবলে পড়ার তুলনামূলক ব্যাখ্যা জানা যাচ্ছে না।
এখন পত্রিকা দুটি বলছে, বৃহস্পতিবার রাতে হামলাকারীরা প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে পৌঁছানোর আগে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সাহায্য চেয়েও তা না পায়নি। 'সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হলে' ডেইলি স্টার ভবনের ছাদে আটকে পড়া কর্মীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা 'চরম অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুভয়ে কাটাতে হতো না' বলে অভিযোগ ডেইলি স্টারের।
বৃহস্পতিবার মধ্য রাত থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অনলাইন কার্যক্রম বন্ধ ছিল, পরে শুক্রবার (১৯শে ডিসেম্বর) রাত থেকে আবার সংবাদমাধ্যম দুটি অনলাইন চালু হয়। সন্ধ্যায় প্রথম আলোর অনলাইনে 'প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা নিয়ে প্রথম আলোর বক্তব্য' শিরোনামো একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এতে 'সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীন' পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা 'জীবন নিয়ে শঙ্কায়' ছিল বলে জানায় প্রথম আলো।
প্রথম আলো অফিস আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা যাওয়ায় এ ব্যাপারে নিরাপত্তা চেয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীসহ নানা মহলের সঙ্গে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল বলেও জানায় প্রতিষ্ঠানটি। 'কিন্তু তারা পৌঁছানোর আগেই অফিস আক্রান্ত হয়ে পড়ে। কর্মরত উদ্বিগ্ন সাংবাদিক ও কর্মীরা জীবন বাঁচাতে কার্যালয় ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। আইন–শৃঙ্খলা ও দমকল বাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে' বলছে প্রথম আলো।
ডেইলি স্টার বলছে, গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে 'সরকারের শিথিল মনোভাব আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। অতীতেও ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো বিভিন্ন মহলের হুমকির মুখে পড়েছে, কিন্তু সেসব ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়নি।' প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার সরকারের 'শুভাকাঙ্ক্ষী' হয়েও সরকারের সহায়তা চেয়ে না পাওয়ায় নানা রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে।
অন্তর্বতী সরকার বৃহস্পতিবার রাতের হামলার ঘটনার ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় পর তাদের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়েছে। কেন হামলা থামানো গেলো না, এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে 'ন্যায়বিচারের' এবং প্রতিষ্ঠান দুটির 'পাশে থাকার' আশ্বাস দিয়েছে সরকার। সরকারের দুটি বিবৃতির কোনোটিতেই হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা বা হামলাকারীদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান সম্প্রতি বলেন, ১৯৯৮ সালে বাজারে আসা দৈনিক প্রথম আলো পথচলার ২৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভীতিকর পরিবেশের মধ্যে ছিল আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে। এ সময়ের মধ্যে পত্রিকাটি ও এর সাংবাদিকেরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত ১৬ বছর স্বৈরাচারী সরকারের আমলে পত্রিকাটি অনেক সত্য কথা বলতে পারেনি।
তিনি বলেন, যতটুকু বলার চেষ্টা করেছে, তাতে তাদের যথেষ্ট চাপের মুখে, বিপদের মুখে পড়তে হয়েছে। পত্রিকাটির প্রচারসংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার বহু চেষ্টা হয়েছে। সরকারের অনেক বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ব্যক্তি খাতের প্রায় ৫০টি কোম্পানির বিজ্ঞাপনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন যে, প্রথম আলো আওয়ামী লীগের শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু, দেশের শত্রু। ওই সরকার চেষ্টা করেছিল প্রথম আলোর মালিকানা কেড়ে নিতে, চেষ্টা করেছিল সম্পাদককে বদল করে দিতে।
তার অভিযোগ, ভারতের এনডিটিভির মালিকানা আদানি গোষ্ঠীর কাছে যাওয়ার মতো শেখ হাসিনা–ঘনিষ্ঠ এস আলম গ্রুপের কাছে প্রথম আলোর জবরদস্তিমূলকভাবে মালিকানা হস্তান্তরের চেষ্টা করা হয়েছিল আওয়ামী লীগের গত সরকারের আমলে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রথম আলো এই পর্যন্ত আওয়ামী লীগ, বিএনপি-জামায়াত, জরুরি অবস্থার তত্বাবধায়ক সরকারের আমল পার করেছে। এখন দেখছে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
মতিউর রহমান গত ৪ঠা নভেম্বর পত্রিকাটির ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ‘আজকের সংবাদপত্র’ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের ওই আয়োজনে প্রথম আলোর শুরুর কথা, এগিয়ে চলা, নানা সময়ের চ্যালেঞ্জসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি। সেখানেই তিনি এসব অভিমত ব্যক্ত করেন।
এতো সরকারের মধ্যে শুধু আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে বেশি নির্যাতিত হওয়ার ও ভীতিকর পরিবেশের মধ্যে থাকার বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান উল্লেখ করেননি মতিউর রহমান। আওয়ামী লীগের সরকারের প্রথম আলোর ‘মালিকানা নিয়ে নেওয়ার ও সম্পাদক বদলের কঠিন উদ্যোগ’ কীভাবে ঠেকিয়েছেন, তা-ও উল্লেখ করেননি মতিউর রহমান। তিনি বলছেন, আমরা এটা বলব না যে সব সময়, সব আমলে, সব সরকারের সময় আমরা সব সত্য কথা বলতে পেরেছি।
খবরটি শেয়ার করুন