ফাইল ছবি
একসময় রাজশাহীর উপশহরের এই বাড়ির সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। বাড়ির মালিক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন কখন বের হবেন, পরিবারের কেউ কখন আসবেন—সেই অপেক্ষায় থাকতেন অনেকে। দেখা হলে সালাম, কুশল বিনিময় কিংবা রাজনৈতিক কোনো বিষয়ে কথা বলার সুযোগ পাওয়াকেই অনেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। কেউ আসতেন সাংগঠনিক বিষয়ে কথা বলতে, কেউ দলীয় কর্মসূচির খোঁজ নিতে, আবার কেউ ব্যক্তিগত কোনো প্রয়োজন বা সুপারিশের আশায়।
রাজশাহীর উপশহরের তিনতলা এই বাড়িটি একসময় তাই শুধু একটি পারিবারিক আবাস ছিল না; স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির একটি পরিচিত ঠিকানাও হয়ে উঠেছিল। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের যাতায়াত ছিল এখানে। স্থানীয় রাজনীতির নানা বিষয়ে আলোচনা ও মতবিনিময়ও হতো বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। কার সাংগঠনিক দায়িত্ব কী হবে, দলের কর্মসূচি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে কিংবা স্থানীয় রাজনীতির বিভিন্ন সমীকরণ—এসব বিষয়েও বাড়িটিকে ঘিরে আলোচনা ছিল।
সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন বাড়িটির সামনে নেই নেতা-কর্মীদের ভিড়, নেই গাড়ির সারি, নেই নিরাপত্তার ব্যস্ততা। রাজনৈতিক বৈঠক কিংবা মানুষের আনাগোনাও নেই। ভাঙা দেয়াল, পোড়া কক্ষ, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইট-পাথর ও ময়লা-আবর্জনায় বাড়িটির বর্তমান চেহারা অনেকটাই বিবর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড়িটির বিভিন্ন অংশ এখন পথচারী, ভবঘুরে ও মাদকসেবীদের আনাগোনার জায়গায় পরিণত হয়েছে। কোথাও পুরোনো কাপড় বিছিয়ে বসার জায়গা তৈরি করা হয়েছে। বাড়ির ভেতর পড়ে আছে বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবনের সরঞ্জাম। উঠান, বারান্দা ও আশপাশের জায়গায় ময়লা-আবর্জনাও জমে আছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাড়িটির কিছু অংশ কার্যত উন্মুক্ত শৌচাগারের মতো ব্যবহৃত হচ্ছে।
একটি পরিবারের বসতবাড়ির এমন পরিণতি নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতারও একটি পরিবর্তিত চিত্র তুলে ধরে। যে বাড়িটি একসময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মানুষের আনাগোনায় সরব ছিল, সেটিই এখন প্রায় পরিত্যক্ত। এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন দেশের রাজনীতিতে পরিচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবারের সদস্য। তিনি জাতীয় চার নেতার অন্যতম এ এইচ এম কামারুজ্জামানের ছেলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কামারুজ্জামান ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারের ভেতরে অন্য তিন জাতীয় নেতার সঙ্গে তাকেও হত্যা করা হয়।
এই রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার বহন করে রাজশাহীর রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন লিটন। তিনি রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০২১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবেও তিনি তিনবার দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮ সালে প্রথমবার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৩ সালে পরাজিত হলেও ২০১৮ সালে আবার নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালেও তিনি মেয়র নির্বাচিত হন।
লিটনের স্ত্রী শাহীন আক্তার রেণীও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে পরিবারটির সঙ্গে রাজশাহীর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিমণ্ডলের একটি দীর্ঘ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। সেই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে রাজশাহীতেও। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ওই দিন লিটন বাড়ির বাইরে ছিলেন। সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি আর বাড়িতে ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরাও দ্রুত বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
এরপর বাড়িটিতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান। বাড়ির দরজা-জানালা, গ্রিলসহ বিভিন্ন সামগ্রীও পরে খুলে নেওয়া হয়। বৈদ্যুতিক তার পর্যন্ত অনেক জায়গা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে বাড়িটি বসবাসের অনুপযোগী ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
বর্তমানে বাড়িটির নিরাপত্তা ও ব্যবহার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন জানান, দিনের বেলাতেও সেখানে কিছু মানুষের আনাগোনা দেখা যায়। সন্ধ্যার পর সেই আনাগোনা বাড়ে। বাড়ির ভেতরে মাদকসেবনের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ গাঁজার গন্ধ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। ইয়াবা ও হেরোইন সেবনের অভিযোগও রয়েছে, যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের সুপারভাইজার কাশমি খান মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বাড়িটির বর্তমান অবস্থা তৈরি হয়েছে। এখন এটি মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের ব্যবহারের জায়গায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনের কাছে বাড়িটির পরিবর্তনটি বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। তিনি বলেন, যে বাড়িতে একসময় প্রবেশের সুযোগ পাওয়াটাই অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এখন সেখানে যে কেউ অবাধে ঢুকতে পারছেন।
তার মতে, রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য হলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়ার কথা নয়। তবে রাজনৈতিক বিরোধ বা ক্ষোভের পরিণতিতে কোনো ব্যক্তির বাড়িঘর পরিত্যক্ত হয়ে পড়া কিংবা তা মাদকসেবীদের আড্ডায় পরিণত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এমন পরিস্থিতি ভবিষ্যতে অন্য কোনো রাজনৈতিক পরিবার বা ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তৈরি হোক—এটিও কেউ চাইবেন না।
বাড়িটির অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। উপশহর পুলিশ ফাঁড়ি থেকে এটি প্রায় ২০ গজ দূরে। এত কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও বাড়িটির ভেতরে মাদকসেবীদের আনাগোনা নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে।
উপশহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক মো. শাহ আলম মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, ভবনটিতে মাদকসেবীরা আসেন—এ বিষয়টি পুলিশের জানা আছে। পুলিশ সেখানে নজরদারিও করে। তবে তারা অল্প সময় অবস্থান করে চলে যাওয়ায় অনেক সময় কাউকে আটক করা সম্ভব হয় না।
বাড়িটিকে ঘিরে লিটনের রাজনৈতিক প্রভাবের নানা গল্পও স্থানীয় রাজনীতিতে প্রচলিত। একসময় কার সঙ্গে দেখা হবে, কখন দেখা হবে—এসব বিষয়েও একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ছিল বলে আওয়ামী লীগের এক নেতা জানিয়েছেন। তার দাবি, লিটনের স্ত্রী শাহীন আক্তার রেণীর ব্যক্তিগত সহকারী অযু অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষাতের বিষয়টি দেখভাল করতেন। তাকে খুশি রাখতে উপঢৌকন বা টাকা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রাজনীতিতে কোনো নেতার সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ, সাক্ষাৎ কিংবা সুপারিশ চাওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন কোনো রাজনৈতিক পরিবার কোনো অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রভাবশালী থাকলে তাদের বাড়ি ঘিরে নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের আনাগোনা তৈরি হতে পারে। লিটনের ক্ষেত্রেও রাজশাহীর রাজনীতিতে তার দীর্ঘ সময়ের ভূমিকার কারণে বাড়িটি এমন একটি পরিচিত ঠিকানায় পরিণত হয়েছিল।
তবে এখন সেই রাজনৈতিক অধ্যায়ের দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন নেই। বাড়ির ভাঙা দেয়াল, পোড়া অংশ, ময়লার স্তূপ ও পরিত্যক্ত কক্ষ যেন সময়ের পরিবর্তনের সাক্ষ্য দিচ্ছে। একসময় যেখানে রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা হতো, সেখানে এখন মানুষের অবাধ যাতায়াত। যে ফটকের সামনে নেতা-কর্মীদের অপেক্ষা দেখা যেত, সেটিই এখন প্রায় অরক্ষিত।
এই পরিবর্তনকে শুধু একজন রাজনীতিক বা একটি পরিবারের ব্যক্তিগত পরিণতি হিসেবে দেখলে বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। কারণ একটি রাজনৈতিক পরিবারের বাড়ি পরিত্যক্ত হয়ে পড়া এবং সেটি মাদকসেবী বা ভবঘুরেদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হওয়া শেষ পর্যন্ত স্থানীয় জনজীবনকেও প্রভাবিত করে। বাড়িটি দ্রুত সংস্কার বা নিরাপদ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা না হলে এর আশপাশের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য, ক্ষোভ কিংবা ক্ষমতার পালাবদল গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের প্রতি রাজনৈতিক বিরোধকে তাদের বসতবাড়ি ধ্বংস, লুটপাট বা দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার ঘটনায় পরিণত করা সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয় না। একইভাবে পরিত্যক্ত একটি বাড়িকে উন্মুক্ত শৌচাগার বা মাদকসেবনের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন যেমন একজন দীর্ঘদিনের রাজনীতিক, তেমনি তিনি দেশের একটি ঐতিহাসিক ও মর্যাদাশীল রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তার রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, তার কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নও রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পারিবারিক আবাসের নিরাপত্তা এবং মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত।
রাজশাহীর উপশহরের বাড়িটি এখন সেই পরিবর্তিত সময়ের নীরব সাক্ষী। একসময় যে বাড়িকে ঘিরে ছিল রাজনৈতিক ব্যস্ততা, এখন সেখানে নীরবতা। একসময় যে ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বা ব্যক্তিগত প্রয়োজন নিয়ে অপেক্ষা করতেন, সেই ফটক এখন প্রায় অরক্ষিত। ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের সময় বদলেছে, বদলে গেছে বাড়িটির পরিচিতিও।
কিন্তু একটি পরিত্যক্ত বাড়ির এই পরিণতি যেন কোনো রাজনৈতিক পরিবারের প্রতি বিদ্বেষের প্রতীক না হয়ে ওঠে—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকা একটি বাড়িকে অন্তত নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন অবস্থায় রাখা প্রয়োজন। কারণ সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থান বদলাতে পারে, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলাতে পারে, কিন্তু একটি শহরের সামাজিক পরিবেশ ও নাগরিক নিরাপত্তার দায়িত্ব সবারই।
খবরটি শেয়ার করুন