রবিবার, ১লা ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** আলী রীয়াজ দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন: মাসুদ কামাল *** ‘আওয়ামী লীগকে ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না’ *** একটি দল প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে বললেও গোপনে ‘না’র প্রচার চালায়: মামুনুল হক *** পচা রাজনীতিকে আমরা পাল্টে দিতে চাই: জামায়াতের আমির *** যারা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে, তাদের ‘গুপ্ত’ বলবেন: তারেক রহমান *** মিরপুর স্টেডিয়ামে সাংবাদিকদের প্রবেশে নতুন বিধিনিষেধ *** ২২৪ কোটি টাকার রপ্তানির আদেশ মিলল বাণিজ্য মেলায় *** অবশ্যই শরিয়াহ মোতাবেক নগরকান্দা-সালথা পরিচালিত হবে: শামা ওবায়েদ *** গণভোট নিয়ে সরকারকে ইসির চিঠি: প্রশ্ন, বিতর্ক ও বাস্তবতা *** আসন্ন নির্বাচনে আসছেন ৩৩০ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক

‘আওয়ামী লীগকে ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না’

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১০:৩৯ অপরাহ্ন, ৩১শে জানুয়ারী ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেছেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে ছাড়া কোনো নির্বাচন পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এমন হবে, যার পাশে একটি ‘দাগ বা প্রশ্নচিহ্ন’ থেকে যাবে। আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের আগ্রহ দলটির আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়েও অনেক গভীরে বিস্তৃত। ফলে রাজনীতি থেকে দলটির পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

তারা বলেন, আওয়ামী লীগ মানে শুধু দলটির নেতৃত্ব নয়। দলটি সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গেও যুক্ত। আওয়ামী লীগ এখন খুব খারাপ অবস্থায় থাকলেও এবং বাংলাদেশে তারা রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে আপাতত ছিটকে পড়লেও ভবিষ্যতে তাদের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিকে অবশ্যই উড়িয়ে দেওয়া উচিত হবে না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

তাদের মতে, আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটকে দলটির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির দুঃসময়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আওয়ামী লীগের গত শাসনামলে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি কার্যকর কোনো রাজনৈতিক বা নির্বাচনী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হিমশিম খাচ্ছিল, বর্তমানে ক্ষমতার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে দলটি ফিরে এসেছে। আওয়ামী লীগ সম্ভবত এখন ‘অপেক্ষা করার কৌশল’ অবলম্বন করছে।

অন্য বিশ্লেষকেরা যুক্তি দিচ্ছেন, আপাতবিরোধী মনে হলেও জামায়াতে ইসলামীর জনসমর্থনের সাম্প্রতিক জোয়ারে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ পুনরুত্থানের একধরনের প্রাসঙ্গিকতা পাওয়া যেতে পারে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল। শেখ হাসিনাসহ দলটির সমালোচকেরা তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বারবার এই ভূমিকার কথা টেনে আনছেন।

তারা বলেন, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে দুবার নিষিদ্ধ হয়েছিল। শেখ হাসিনার শাসনামলে দলটির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি হয়েছিল ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তবু দলটি টিকে আছে এবং জনমত জরিপ অনুযায়ী, আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারা তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল করার সন্ধিক্ষণে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান আল জাজিরাকে যুক্তি দেখিয়েছেন, কঠোর গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে ছাড়া কোনো নির্বাচন পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি বলেন, ১২ই ফেব্রুয়ারি এমন নির্বাচন হবে, যার পাশে একটি ‘দাগ বা প্রশ্নচিহ্ন’ থেকে যাবে।

একই সঙ্গে কুগেলম্যান বলেন, শেখ হাসিনার তদারকিতে চালানো দমন-পীড়ন এবং নির্বাচনী মাঠ নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার অতীতের অপচেষ্টার কারণে অনেক বাংলাদেশির চোখে আওয়ামী লীগ একটি বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে গণ্য হওয়ার অধিকার হারিয়েছে।

২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনা নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছিলেন। এসব নির্বাচনে কারসাজি হয়েছিল বলে ধরে নেওয়া হয়। বিরোধী দলগুলো এসব নির্বাচন বর্জন করে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল।

তবু কুগেলম্যান মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার বংশানুক্রমিক নেতৃত্বে পরিচালিত রাজনৈতিক দলগুলোর বৈশিষ্ট্য এমন যে তারা খুব কমই বিলুপ্ত হয়।

কুগেলম্যান আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এখন খুব খারাপ অবস্থায় থাকলেও এবং বাংলাদেশে তারা রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছিটকে পড়লেও ভবিষ্যতে তাদের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিকে অবশ্যই উড়িয়ে দেওয়া উচিত হবে না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।’

আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটকে দলটির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির দুঃসময়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন কুগেলম্যান। শেখ হাসিনার গত শাসনামলে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি কার্যকর কোনো রাজনৈতিক বা নির্বাচনী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হিমশিম খাচ্ছিল, বর্তমানে ক্ষমতার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে দলটি ফিরে এসেছে।

কুগেলম্যান বলেন, আওয়ামী লীগ সম্ভবত একটি ‘অপেক্ষা করার কৌশল’ অবলম্বন করবে। যত দিন শেখ হাসিনা রাজনীতিতে সক্রিয় থাকবেন, তিনি হয়তো ‘রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যেই থাকতে’ চাইবেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন।

কুগেলম্যান বলেন, ‘এতে সময় লাগতে পারে। এই অঞ্চলের রাজনীতির ধরন বিবেচনা করলে দেখা যায়, তা বেশ অস্থির ও পরিবর্তনশীল। ভবিষ্যতে যদি কোনো সুযোগ তৈরি হয় এবং আওয়ামী লীগ একটি কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাঠে নামার মতো অবস্থানে পৌঁছাতে পারে, তবে দলটি ভালোভাবে ফিরে আসতে পারে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এসব বিষয়ে আল জাজিরাকে বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান রাজনৈতিক তৎপরতা, প্রভাব ও দৃঢ় অবস্থান, যাকে এমনকি আধিপত্যের প্রদর্শন বলা যেতে পারে, তা বিস্ময়করভাবে আওয়ামী লীগের জন্য একধরনের আশীর্বাদ হিসেবে দেখা যেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের আগ্রহ দলটির আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়েও অনেক গভীরে বিস্তৃত। ফলে রাজনীতি থেকে দলটির পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।’

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ মানে শুধু দলটির নেতৃত্ব নয়। দলটি সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গেও যুক্ত।’ ‘ক্যান বাংলাদেশস আওয়ামী লীগ সারভাইভ ইলেকশন ব্যান, এক্স পিএম হাসিনাস এক্সাইল’ শিরোনামে আল জাজিরার গতকাল শুক্রবার (৩০শে জানুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আনু মুহাম্মদের এই মন্তব্য যুক্ত হয়।

এদিকে আজীবন আওয়ামী লীগের ভোটার রাজবাড়ী জেলার নৌকাচালক রিপন মৃধা আল জাজিরাকে বলেন, তিনি যে দলকে সমর্থন করেন, সেই দলকে নিষিদ্ধ করার পর ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে তার তেমন আগ্রহ নেই।

প্রায় ৫০ বছর বয়সী মাঝি রিপন মৃধা জানান, পরিবারের সদস্যরা ভয় পাচ্ছেন যে ভোট না দিলে তারা আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন। এটা এমন সময়ে হতে পারে যখন কয়েক দশকের হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ঘটনায় শেখ হাসিনা ও তার দল এখনো ব্যাপক ক্ষোভের মুখে রয়েছে।

রিপন মৃধা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা যদি ভোট না দিই, তাহলে আমরা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারি। সে কারণে আমাদের পরিবারের সদস্যরা ভোটকেন্দ্রে যাবে।’

১৯৭৫ সালে সেনা অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে মৃধা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু (শেখ হাসিনার বাবাকে ভালোবেসে এ নামে ডাকা হয়) সপরিবার নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ কীভাবে টিকে থাকার লড়াই করেছিল, সে কথা আমার বাবা প্রায়ই বলতেন।’ ওই ঘটনা আওয়ামী লীগকে প্রথমবারের মতো বড় সংকটে ফেলেছিল।

মাইকেল কুগেলম্যান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250