শনিবার, ৩১শে জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ‘আওয়ামী লীগকে ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না’ *** একটি দল প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে বললেও গোপনে ‘না’র প্রচার চালায়: মামুনুল হক *** পচা রাজনীতিকে আমরা পাল্টে দিতে চাই: জামায়াতের আমির *** যারা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে, তাদের ‘গুপ্ত’ বলবেন: তারেক রহমান *** মিরপুর স্টেডিয়ামে সাংবাদিকদের প্রবেশে নতুন বিধিনিষেধ *** ২২৪ কোটি টাকার রপ্তানির আদেশ মিলল বাণিজ্য মেলায় *** অবশ্যই শরিয়াহ মোতাবেক নগরকান্দা-সালথা পরিচালিত হবে: শামা ওবায়েদ *** গণভোট নিয়ে সরকারকে ইসির চিঠি: প্রশ্ন, বিতর্ক ও বাস্তবতা *** আসন্ন নির্বাচনে আসছেন ৩৩০ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক *** বিদ্যুৎগ্রাহকদের জন্য সুখবর

গণভোট নিয়ে সরকারকে ইসির চিঠি: প্রশ্ন, বিতর্ক ও বাস্তবতা

উপ-সম্পাদকীয়

🕒 প্রকাশ: ০৭:০৬ অপরাহ্ন, ৩১শে জানুয়ারী ২০২৬

#

ফাইল ছবি

শায়লা শবনম

গণভোটের ইতিহাসে এবার এক জটিল প্রশ্ন সামনে এসেছে— সরকারি কর্মকর্তারা কী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’–এর পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবেন? এ প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও জনমনে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কারের উপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গত বৃহস্পতিবার (২৯শে জানুয়ারি) সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক আচরণ না করার নির্দেশনা দিয়েছে।

ইসির নির্দেশনা স্পষ্ট— প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কেউ জনগণকে তথ্য দিতে বা সচেতন করতে পারবেন, কিন্তু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’–এর পক্ষে কোনো প্রকার আহ্বান বা প্রচারণা করা যাবে না। এ ধরনের কার্যক্রম গণভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে এবং তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। নির্দেশনাটি সব রিটার্নিং কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছে এবং এর অনুলিপি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিবসহ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

এই চিঠির সঙ্গে যুক্ত আইনি বিধানও স্পষ্ট। গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬–এ বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা যদি তার পদমর্যাদা ব্যবহার করে ভোটের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তবে তিনি সর্বনিম্ন এক বছর থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এটি নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে।

তবে ইসির এই পদক্ষেপের সঙ্গে সরকারের চলমান প্রচারণা মিলিয়ে দেখা গেলে দ্বৈত মানদণ্ডের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। সরকার গত বছরের ২২শে ডিসেম্বর থেকে ‘ভোটের গাড়ি—সুপার ক্যারাভান’ উদ্বোধন করে গণভোটের প্রচারণা কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ভিডিও বার্তায় সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন। তার পরের দিন থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা জেলায় গিয়ে সভা, সমাবেশ এবং মতবিনিময়ের মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন।

সরকারের যুক্তি অনুযায়ী, এই প্রচারণায় কোনো আইনি বাধা নেই। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, শীর্ষ আইন বিশেষজ্ঞদের লিখিত মতামত অনুযায়ী সরকার গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে সক্ষম। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, সরকারি প্রচারণা এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০টির বেশি জেলায় সরাসরি পরিচালিত হয়েছে। সুপার ক্যারাভানের মাধ্যমে ৬৪ জেলা এবং ৩০০ উপজেলায় প্রচারণা কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এ উদ্দেশ্যে গণভোট ও জনপ্রচারে ৬টি মন্ত্রণালয়কে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইসি সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, এদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে এসব মন্ত্রণালয়কে আলাদাভাবে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার নজির নেই।

ইসির নির্দেশনা ও সরকারের কার্যক্রমের মধ্যে যে ফাটল দেখা যাচ্ছে তা শুধু আইনি নয়; এটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি নিয়েও প্রশ্ন তোলে। একদিকে, নির্বাচন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা রক্ষার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগের কথা বলছে, অন্যদিকে সরকার ব্যাখ্যা দিচ্ছে যে তাদের প্রচারণা আইনি। এই দ্বৈত অবস্থার মধ্যে সাধারণ ভোটার এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে অস্পষ্টতা তৈরি হচ্ছে।

গণভোটের নিরপেক্ষতা শুধু আইন বা প্রচারণার সীমারেখার বিষয় নয়। এটি দেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও নাগরিক সচেতনতার ওপরও নির্ভর করে। সরকারি কর্মকর্তা যদি পক্ষপাতমূলকভাবে প্রচারণায় যুক্ত হন, তাহলে গণভোটে জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ ক্ষুণ্ণ হতে পারে। এটি দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সরকারি পক্ষের অবস্থানও ব্যাখ্যা করে— আইনি প্রতিবন্ধকতা না থাকায় তারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনসচেতনতা ও প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে ইসির স্পষ্ট সতর্কবার্তা এই প্রচারণাকে সীমিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। এটি একটি রাজনৈতিক-আইনি দ্বন্দ্বের মধ্যে নাভিশ্বাসের মতো। গণভোটের ফলাফল কেবল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অংশ নয়; এটি দেশের সংবিধানিক সংস্কারের বাস্তবায়নেও প্রভাব ফেলে।

গত ১৯শে জানুয়ারি প্রথমবারের মতো প্রধান উপদেষ্টা সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেন। ভিডিও বার্তায় জনগণকেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকার আহ্বান জানান, যা সরকারের প্রচারণাকে আরও দৃঢ় করে তোলে। এ ধরনের ব্যক্তিগত উদ্যোগের সঙ্গে সরকারি সম্পদের ব্যবহার মিলিয়ে গেলে আইনি এবং নৈতিক সীমারেখা স্পষ্ট করা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ সরকারি পদমর্যাদা ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক বা গণভোটের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা আইনত দণ্ডনীয়।

সরকার ও ইসির এই দ্বন্দ্বের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো— সরকারি কর্মকর্তাদের কোন পর্যায়ে অংশগ্রহণ গ্রহণযোগ্য এবং কোথায় তা আইনগতভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ইসি নির্দেশনা স্পষ্ট: জনগণকে তথ্য বা সচেতনতা প্রদান করা যাবে, কিন্তু কোনো পক্ষের পক্ষে আহ্বান করা যাবে না। অন্যদিকে, সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় আইনগত পরামর্শ নিয়ে তারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

এই পরিস্থিতিতে ভোটারদের সচেতনতা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখার গুরুত্ব বেড়ে যায়। সরকারি প্রচারণা ও উপদেষ্টাদের বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে এটি গণভোটের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। নির্বাচন কমিশনের শক্ত অবস্থান এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনীয় এবং এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি নীতি-নির্ধারণী উদাহরণ স্থাপন করতে পারে।

অবশেষে বলা জরুরি, গণভোটে সরকারের প্রচার, ইসির নির্দেশনা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি গণভোট কেবল একটি সংস্কার প্রস্তাবের বিষয় নয়; এটি নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা পরীক্ষা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠিও বটে।

গণভোট ইস্যুতে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, নির্বাচনি সংস্কারের এই পর্যায়ে জনগণ এবং প্রশাসনকে দায়িত্বপূর্ণ ও সতর্ক ভূমিকা পালন করবে হবে। সরকার যদি প্রচারণা চালায়, তবে তা স্বচ্ছতা ও আইনি সীমারেখার মধ্যে থাকতে হবে।

ইসি নির্দেশনা সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষপাত রোধ করতে কঠোর হলেও তা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গণভোটের সুষ্ঠু ফলাফল নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। এই দ্বন্দ্ব কেবল আইন বা প্রচারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংবিধানিক সংস্কারের প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

গণভোটের প্রেক্ষাপটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’–এর প্রচারণা নিয়ে এই বিতর্ক একদিকে সরকার ও নির্বাচনের শীর্ষ সংস্থার মধ্যেকার দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে এটি জনগণের সচেতন অংশগ্রহণের জন্য একটি সুযোগও প্রদান করছে। সুষ্ঠু, অবাধ এবং নিরপেক্ষ গণভোট নিশ্চিত করতে হলে আইন, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন অপরিহার্য।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

শায়লা শবনম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250