নিউ এজ পত্রিকায় আজ সোমবার প্রকাশিত কার্টুন।
গুজব, ভুয়া খবর ও অপতথ্যের ভিড়ে পাঠক-দর্শকের কাছে সঠিক খবর পৌঁছে দিতে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে ফ্যাক্ট-চেকার থাকা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন। তাদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তির বিকশিত হওয়ার বর্তমান সময়ে যেভাবে অপতথ্য ছড়াচ্ছে, এমন বাস্তবতায় সত্য তথ্যের মাধ্যমে গণমাধ্যমগুলোর মানুষের আস্থা অর্জন সবচেয়ে বেশি জরুরি। সেজন্যই সংবাদমাধ্যমগুলোর ফ্যাক্ট-চেকার রাখা জরুরি।
তবে গণমাধ্যমে ফ্যাক্ট-চেকার থাকা নিয়ে ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, একটি গণমাধ্যমের কেন ফ্যাক্ট-চেকার দরকার হবে? কারণ, প্রত্যেক প্রতিবেদক নিজেই একজন ফ্যাক্ট-চেকার। পেশাদার সাংবাদিকতায় এটার দরকার নেই। গতকাল রোববার (২৩শে নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৫ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘কীভাবে ভুয়া তথ্য শাসনব্যবস্থার হাতিয়ার হয়ে উঠল’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
বিশিষ্ট সাংবাদিক নূরুল কবীর যেদিন বক্তব্য দেন যে, গণমাধ্যমে আলাদা ফ্যাক্ট-চেকার থাকার দরকার নেই, সেদিনই তার সম্পাদিত পত্রিকায় প্রকাশের জন্য হয় আঁকা হয় একটি কার্টুন। যা সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নামে ভাইরাল হওয়া ভুয়া ফটোকার্ডের বক্তব্যের ভিত্তিতে আঁকা। কার্টুনটি আজ সোমবার (২৪শে নভেম্বর) নিউ এজের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে।
কার্টুনটিতে দেখা যায়, সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এক হাতে বাউলদের ঠেলে দিচ্ছেন, তার আরেক হাতে লালন শাহের বাঁধানো ছবি, এর মাধ্যমে তিনি সরকারি উদ্যোগে সম্প্রতি আয়োজিত লালন উৎসবের প্রচারণা চালাচ্ছেন।
কার্টুনটি মূলত মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নামে ভাইরাল হওয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে আঁকা। যেখানে বলা হয়, উপদেষ্টা বলেছেন, ‘কোথাকার এক বাউলকে পানিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় এত চিৎকার-চেঁচামেচি করা হচ্ছে, কিন্তু লালন উৎসব আয়োজন নিয়ে কোনো কৃতজ্ঞতা নাই। এই সব আচরণ স্বৈরাচারদের ফিরে আসার পথ সুগম করে।’
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বক্তব্য হিসেবে একটি ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে অনুসন্ধান চালিয়ে নিশ্চিত হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ফ্যাক্ট।
প্রেস উইং ফ্যাক্টের অনুসন্ধানে দেখা যায়, সংস্কৃতি উপদেষ্টা এমন কোনো মন্তব্য করেননি। আলোচিত ফটোকার্ডে কথিত এই বক্তব্যের কোনো সূত্র নেই। ফেসবুকে মন্তব্যের ঘরে একজন এই বক্তব্যের উৎস জানতে চাইলে ভুয়া তথ্য প্রচারকারী জানান, তিনি এটি কোনো এক ‘বিশ্বস্ত’ সূত্র থেকে জেনেছেন। তবে তার তথাকথিত সেই সূত্র সম্পর্কে কোনো তথ্য তিনি দিতে পারেননি।
ভুয়া তথ্য প্রচারকারী ‘এ এইচ লিমন’র ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সাম্প্রতিক পোস্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের পক্ষে নিয়মিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও গণমাধ্যমগুলো অনুসন্ধান করেও তার নামে এমন কোনো বক্তব্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ফারুকী স্পষ্টভাবে জানান, তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি। তার নামে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সরকারকে ঘিরে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
এদিকে বাউল আবুল সরকারের গ্রেপ্তার হওয়াকে কেন্দ্র করে চলমান ঘটনাটিকে নিজের জন্য ‘সবচেয়ে অস্বস্তিকর’ বলে দাবি করেছেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। আজ সোমবার সন্ধ্যায় তিনি এ বিষয়ে দীর্ঘ একটি প্রতিক্রিয়া শেয়ার করেন নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টের দেয়ালে। যেখানে তাকে আরও আক্রমণ করার জন্য তৈরি হতে অনুরোধ করেন সমালোচকদের প্রতি।
বাউলশিল্পীদের ওপর হামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় সংস্কৃতি উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলেছেন, তাদের উদ্দেশে ফারুকী এই প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন, ‘আবুল সরকারকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এটা জানা মাত্রই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করি। তখন সেখান থেকে আমাকে একটা ভিডিও ক্লিপ পাঠানো হয় এবং পরিস্থিতির উত্তাপ ও ঝুঁকির দিকগুলো ব্যাখ্যা করা হয়। আমি বুঝতে পারি একটা সংকটের দিকে যাচ্ছে পুরা ব্যাপারটা। তাছাড়া যেকোনও ফৌজদারি অপরাধে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। আমি আমার পক্ষ থেকে যা যা করার বা বলার তা তা করছি এবং বলছি। এর বেশি এখানে লেখাও আমার পক্ষে সঙ্গত কারণে সম্ভব না।’
তবে বিষয়টি নিয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন বলে জানিয়েছেন। সবাইকে ধৈর্য ও সংযমের অনুরোধ করেন ফারুকী। বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সবাইকে ধৈর্য এবং সংযম প্রদর্শনের জন্য অনুরোধ করছি। ধর্মীয় এবং সামাজিক সম্প্রীতিই কেবল আমাদের দেশটাকে সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে নিতে পারবে, অন্য কিছু কেবল ধ্বংসের দিকেই নিবে।’
খবরটি শেয়ার করুন